খেলাপি ঋণের পরিমাণ অনেক আগেই মাত্রা ছাড়িয়েছে। এটি এখন অর্থনীতিতে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন উদ্বেগজনক। সম্প্রতি গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট খেলাপি ঋণের প্রায় ৬০ শতাংশ আটকে আছে পাঁচ হাজার ১১৩টি বড় প্রতিষ্ঠানের কাছে, টাকার অঙ্কে যা তিন লাখ ৩২ হাজার ৫০৪ কোটি টাকা। ২০ কোটি টাকার বেশি ঋণগ্রহীতা এবং বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেই খেলাপি হওয়ার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। ২০২৪-এর আগস্টের আগে ১৭ বছর ধরে দেশে যে লুটপাটের সংস্কৃতি অনুসরণ করা হয়েছে ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়া ছিল তারই অংশ। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ব্যাংক থেকে বিপুল অঙ্কের ঋণ নিয়ে তা ব্যবসায় বিনিয়োগ না করে নানা কৌশলে তসরুপ করা হয় এবং এর বড় অংশ বিদেশে পাচার করা হয়। ফলে ব্যাংক খাত ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছায়। সার্বিকভাবে অর্থনীতি পঙ্গু হয়ে পড়ার উপক্রম হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে কিছুটা শৃঙ্খলা ফেরানোর চেষ্টা করা হয়েছে; কিন্তু তা যথেষ্ট ছিল না।
গত বছরের নভেম্বরের হিসাব অনুযায়ী, দেশে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে সাড়ে ছয় লাখ কোটি টাকা, যা বিতরণ করা মোট ঋণের প্রায় ৩৬ শতাংশ। অর্থাৎ বিতরণ করা ঋণের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি খেলাপি। এ পরিসংখ্যান বিশ্বে নজিরবিহীন।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক খাতের বিতরণ করা মোট ঋণের পরিমাণ ১৮ লাখ তিন হাজার ৮৪০ কোটি টাকা। এর এক-তৃতীয়াংশ খেলাপি। এটিও বাংলাদেশ ব্যাংকেরই হিসাব।
বলা হয়, আওয়ামী ফ্যাসিবাদী জমানায় ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ কমিয়ে দেখানো হতো, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তা বন্ধ হয়। ফলে প্রকৃত চিত্র উঠে আসে।
বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, মাত্রাতিরিক্ত খেলাপি ঋণ ঋণ-ব্যবস্থাপনা এবং সার্বিকভাবে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা তুলে ধরছে। এতে করে ব্যাংক খাতে বহুমাত্রিক ঝুঁকি সৃষ্টি হয়েছে। সামগ্রিক অর্থনীতি দুর্বল হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, খেলাপি ঋণ মাত্রাতিরিক্ত হারে বাড়লে, ব্যাংক খাতে এর নানা ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। ঋণ আদায় কমে যায়, ব্যাংকের আয় হ্রাস পায়, একপর্যায়ে তা মূলধন ঘাটতি বাড়িয়ে দেয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা ও ব্যাংকিং খাতের সুস্থতা বজায় রাখার জন্য খেলাপি ঋণের ঊর্ধ্বগতি কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
কার্যত এটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকেরই দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ হলে দেশের বড় প্রতিষ্ঠানগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনা কঠিন নয়।
কারা ঋণ নিয়ে অর্থ নয়ছয় করেছে, কারা কী কৌশলে অর্থ পাচার করেছে সেটি উদঘাটন করা জরুরি। দেশবাসী আশা করে, নতুন সরকার এ বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেবে, বিশেষ করে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি বা যারা রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ঋণ নিয়ে পাচার করেছে তাদের রাষ্ট্রদ্রোহী হিসেবে গণ্য করতে হবে। কারণ অর্থনীতি ধ্বংস করা যেকোনো বিচারে দেশের সাথে বিশ্বাসঘাতকতার নামান্তর। এদের পরিচয় জনসমক্ষে প্রকাশ এবং আইনি প্রক্রিয়ায় সম্পদ জব্দ করতে হবে। এদের প্রতি ছাড় দেয়া হলে আর্থিক খাতে সুশাসন ফেরানো যাবে না, অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের আশা হবে সুদূরপরাহত।



