সরকারি হাসপাতালে লুটপাট, সেবার জায়গায় অনিয়মের মহামারী

দেশের সরকারি হাসপাতালগুলো কি সেবার আশ্রয়, নাকি দুর্নীতির অভয়ারণ্য? দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একের পর এক অভিযানে যে চিত্র উঠে আসছে, সেটা কেবল বিচ্ছিন্ন অনিয়মের গল্প নয়; বরং একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার নির্মম ছবি।

গত এক বছরে ১১১টি সরকারি হাসপাতালে অভিযান চালিয়ে দুদক যে তথ্য তুলে ধরেছে, তা রীতিমতো আতঙ্কজনক। রোগীর খাবারে অনিয়ম, টেন্ডার ও আর্থিক দুর্নীতি, ওষুধ ও যন্ত্রপাতি ব্যবস্থাপনায় লুটপাট, চিকিৎসক-নার্সের অনুপস্থিতি- প্রতিটি খাতেই অনিয়ম। সবচেয়ে বেশি অনিয়ম ধরা পড়েছে রোগীর খাবার সরবরাহে। কাগজে খাবারের বিল করা হয়। কিন্তু বাস্তবে অপুষ্টিকর বা অপ্রতুল খাবার দেয়া হয়। একজন অসুস্থ মানুষের ন্যূনতম খাবারও যদি লুটপাটের শিকার হয়, তাহলে মানবিকতার অবস্থান কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়?

নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দুদকের ছদ্মবেশী অভিযানের খবর প্রকাশ করেছে সহযোগী একটি দৈনিক। এতে দেখা গেছে, ভর্তি হওয়া রোগীদের অনেকেই খাবার পাননি, চিকিৎসকরা সময়মতো উপস্থিত নন, হাসপাতাল অপরিচ্ছন্ন। এই চিত্র কেবল একটি হাসপাতালের নয়; বরং দেশের বিভিন্ন প্রান্তে একই ধরনের অভিযোগ আছে।

রংপুর ও সিলেটের ন্যাশনাল ইলেকট্রো মেডিক্যাল ইকুইপমেন্ট মেইনটেন্যান্স ওয়ার্কশপে পুরনো যন্ত্রে নকল স্টিকার লাগিয়ে নতুন হিসেবে সরবরাহের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এটি সরকারি অর্থ আত্মসাতের নতুন মাত্রা। জাতীয় অর্থোপেডিক ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে অধিকাংশ জীবনরক্ষাকারী যন্ত্র অকেজো পড়ে আছে। এটা প্রমাণ করে অব্যবস্থাপনা এখন কাঠামোগত সঙ্কটে রূপ নিয়েছে।

সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থেকেও বেতন তোলার ঘটনা, টাঙ্গাইল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে রিএজেন্ট কেনাকাটায় অনিয়ম কেবল প্রশাসনিক দুর্বলতা নয়, জবাবদিহির অভাবের নগ্ন প্রকাশ। চিকিৎসকের পরিবর্তে টেকনোলজিস্ট বা মেডিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট দিয়ে রোগী দেখানো স্বাস্থ্যসেবার মানকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

সরকারি স্বাস্থ্য খাতে প্রতি বছর বিপুল বাজেট বরাদ্দ হয়। কিন্তু মাঠপর্যায়ে তার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত না হলে এই বরাদ্দ কেবল কাগুজে উন্নয়নেই সীমাবদ্ধ থাকবে। দালালচক্রের দৌরাত্ম্য, সরকারি ওষুধ বাইরে বিক্রি, মেয়াদোত্তীর্ণ রিএজেন্ট দিয়ে পরীক্ষা— এসব অনিয়ম রোগীর জীবনকে সরাসরি ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেয়।

এই বাস্তবতায় কেবল অভিযানে অনিয়ম ধরা পড়লেই চলবে না; প্রয়োজন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি। দুদকের অভিযানে আইনি প্রক্রিয়া চলমান থাকলেও সেটা যেন দীর্ঘসূত্রতায় হারিয়ে না যায়। একই সাথে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে অভ্যন্তরীণ নজরদারি জোরদার করতে হবে। ডিজিটাল উপস্থিতি মনিটরিং, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, হাসপাতালভিত্তিক নাগরিক পর্যবেক্ষণ কমিটি গঠনের উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি।

সবচেয়ে বড় কথা, স্বাস্থ্য খাতকে কেবল অবকাঠামো উন্নয়ন দিয়ে সাজালেই হবে না; মানবিকতা ও জবাবদিহির সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সরকারি হাসপাতাল গরিব ও প্রান্তিক মানুষের সেবার আশ্রয়। সেখানে যদি লুটপাটই নিয়ম হয়ে দাঁড়ায়, তবে রাষ্ট্রের সামাজিক চুক্তিই প্রশ্নের মুখে পড়ে।

স্বাস্থ্যসেবা কোনো দয়া নয়; এটি সাংবিধানিক অধিকার। সেই অধিকার রক্ষায় সরকার, প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সবার কঠোর অবস্থান দরকার। না হয় হাসপাতালের করিডোরে প্রতিধ্বনিত হতে থাকবে বঞ্চনার দীর্ঘশ্বাস।