জাতীয় জীবনে আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই নির্বাচনের ওপর নির্ভর করছে দেশের সামগ্রিক ভবিষ্যৎ। তাই অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ একটি নির্বাচন আয়োজন সর্বোচ্চ চাওয়ায় পরিণত হয়েছে। কোনোভাবে এ নির্বাচন বিতর্কিত হলে গণতন্ত্রের মসৃণ উত্তরণ সম্ভব হবে না। এতে সংস্কারপ্রক্রিয়া মুখথুবড়ে পড়বে। পরিণামে জাতির শত্রুরা হাসিনার পালানোর পর থেকে যা চাচ্ছে- পুরো জাতি বিপর্যয়ে পড়ুক, সেই আশঙ্কা বাস্তবে পরিণত হবে। দেশে-বিদেশে ফ্যাসিবাদী চক্রের সাথে প্রশাসনের অভ্যন্তরে ঘাপটি মেরে থাকা তাদের সহযোগীরা পুরোদমে সক্রিয় রয়েছে। নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ করার সব সুযোগ তারা গ্রহণ করবে। ইতোমধ্যে তাদের সেই উপসর্গ প্রকাশ পাচ্ছে।
সংসদ সদস্য পদে প্রার্থিতা যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় প্রশাসনের পুরনো লোকদের অতি উৎসাহী কার্যক্রম চোখেপড়ার মতো। বেসামরিক প্রশাসনের ওই অংশটি ১১ দলীয় জোট ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর অনেকের ঠুনকো কারণে মনোনয়ন বাতিল করেছে। অন্য দিকে ফৌজদারি অপরাধসহ নানা ত্রুটি থাকার পরও অনেকের প্রার্থিতা বৈধ হিসেবে ছাড় দিয়েছে। প্রার্থীদের মনোনয়ন যাচাইয়ে ইতোমধ্যে সারা দেশ থেকে যে তথ্য পাওয়া গেছে, প্রশাসনের এ পক্ষপাত স্পষ্ট।
দ্বৈত নাগরিকত্বের অভিযোগে কুড়িগ্রাম-৩ আসনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মাহবুবুল আলমের প্রার্থিতা বাতিল করেছেন রিটার্নিং অফিসার। অন্য দিকে একই অভিযোগ থাকার পরও ফেনী-৩ আসনে বিএনপি প্রার্থী আব্দুল আউয়াল মিন্টুর মনোনয়ম বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। কক্সবাজার-২ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদের প্রার্থিতা বাতিল করা হয়েছে আরো ঠুনকো কারণে। তার বিরুদ্ধে ২০১৩ সালে ফ্যাসিবাদী শাসনামলে আদালত অবমাননার অভিযোগ আনা হয়। সেটি ছিল সাজানো একটি মামলা। এর পরে তিনি ফ্যাসিবাদী আমলে ২০১৮ সালে নির্বাচনে প্রার্থী ছিলেন। এ ধরনের ঠুনকো অভিযোগ আছে; এমন অনেকের প্রার্থিতা ইতোমধ্যে বৈধতা পেয়েছে। উদ্বেগের ব্যাপার হচ্ছে- তার প্রার্থিতা বাতিলের পর প্রশাসনের উপস্থিত লোকজন আনন্দ প্রকাশ করে হাততালি দেন। অর্থাৎ- প্রশাসনের ভেতরে প্রকাশ্যে নির্বাচনী কার্যক্রম শুরু হতে না হতে পক্ষপাত শুরু হয়ে গেছে।
এ দিকে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পদবিতে থাকা এমনকি জুলাই অভ্যুত্থানে খুনের মামলার আসামিদের মনোনয়ন বৈধ হয়েছে অনেক জায়গায়। নির্বাচনে পক্ষপাতমূলক কাজে জড়িত থাকা কর্মকর্তাদের ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে জানা যাচ্ছে, তারা বিগত ফ্যাসিবাদী জমানায় নানা মাত্রায় সুবিধাভোগী ও সহযোগী। তারা চান না, একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে দেশ শান্তি ও সমৃদ্ধির ধারায় ফিরুক। জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল ইতোমধ্যে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের পক্ষপাতমূলক কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করেছেন। তুচ্ছ ও গুরুত্বহীন বিষয়ে যোগ্য প্রার্থীদের প্রার্থিতা বাতিলকে উদ্দেশ্যমূলক ও বৈষম্যমূলক বলে উদ্বেগ জানিয়েছেন।
ফ্যাসিবাদ-উত্তর বাংলাদেশ এখনো ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। এই সময়ে দেশী-বিদেশী শত্রু অত্যন্ত তৎপর। এ অবস্থায় একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে হলে প্রশাসনকে সর্বোচ্চ নিরপেক্ষতা প্রদর্শন করতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য এটিই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ প্রশাসনের একটি বড় অংশ ফ্যাসিবাদের সুবিধাভোগী। এদের নিয়ন্ত্রণে আনা না গেলে অন্তর্বর্তী সরকারের সব অর্জন যেকোনো সময় তারা ভণ্ডুল করে দিতে পারে। সরকারের উচিত রিটার্নিং অফিসার ও তাদের আশপাশে যারা রয়েছেন; তাদের গতিবিধি ও কর্মকাণ্ড সার্বক্ষণিক নজরদারি এবং জবাবদিহিতে আনা। যাতে প্রশাসন পক্ষপাতহীন ভারসাম্যমূলক আচরণ করতে বাধ্য হয়।



