দেড় দশকের বেশি সময় ধরে চলা দেশবাসীর ভোটাধিকার বঞ্চনার অবসান হয়েছে। বহুল কাঙ্ক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে। সারা দেশের মানুষ এতে স্বতঃস্ফূর্র্ত অংশ নিয়েছে। তবে ভোট গণণা ও ফল ঘোষণায় কিছু ধোঁয়াশা এড়ানো গেলে একে ইতিহাসের সবচেয়ে সফল নির্বাচন বলা যেতো। অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর মানুষের যে উচ্চাশা তৈরি হয়েছিল সে ক্ষেত্রে তা আরো ইতিবাচক শেষ হতে পারত। তবে এ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে অনিশ্চয়তার অবসান হতে যাচ্ছে। নানাভাবে নির্বাচন বাধাগ্রস্ত করে দেশে অস্থিরতা তৈরির অপপ্রয়াসেরও ইতি ঘটছে।
এবারের নির্বাচনে সব শ্রেণী-পেশার মানুষ অবাধে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। পেশিশক্তি ব্যবহার করে ভোটে জেতার কিছু চেষ্টা দেখা গেলেও প্রশাসনের নিরপেক্ষ ভূমিকায় তা সফল হয়নি। কেন্দ্র দখল ব্যালট বাক্স ছিনতাই সন্ত্রাস সৃষ্টির পুরনো রেওয়াজ থেকে জাতি মুক্তি পেয়েছে। জালভোট দেয়াসহ অন্যান্য নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের কিছু ঘটনা ঘটেছে। কিছু ক্ষেত্রে ভ্রাম্যমাণ আদালত তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ন্ত্রণে সর্বোচ্চ সতর্কতা দেখা গেছে। বেসামরিক প্রশাসনের সহযোগী হয়ে সেনাবাহিনী নিরপেক্ষভাবে কাজ করেছে।
এবারের নির্বাচনের উল্লেখ করার মতো ঘটনা ছিল প্রতিযোগী প্রার্থীদের মধ্যে সম্প্রীতির মনোভাব। তাদের প্রচারে নিয়োজিত নেতাকর্মীরা একে অপরের সাথে সৌহার্দ্য প্রদর্শন করেছেন। নির্বাচনের দিন পাশাপাশি ক্যাম্পে কোনো ধরনের বৈরী আচরণ লক্ষ করা যায়নি। প্রতিযোগী প্রার্থীদের এজেন্টরাও ভোটকেন্দ্রে বন্ধুত্বপূর্ণ সহাবস্থান করেছেন। বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে এটিকে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন বলা যায়। তবে ভোটের ফল তৈরি ও ঘোষণায় রহস্যজনক ধীরগতি দেখা গেছে। কিছু কেন্দ্রের ফল পরিষ্কার হয়ে গেলেও ঘোষণা করতে বিলম্ব হয়। কিছু গুরুত্বপূর্ণ আসন ঘিরে একটি লুকোচুরিভাব দেখা গেছে। রেজাল্টশিটে কাটাছেঁড়ার ঘটনা ঘটেছে। বিশেষ করে স্বল্প ব্যবধানে জয়-পরাজয় নির্ধারিত হতে যাওয়া কিছু আসনে এমনটা ঘটায় সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
১১ দলীয় জোট কিছু ক্ষেত্রে ফল গরমিল ও ফল সাজানোর অভিযোগ করেছে। এ ব্যাপারে তারা নির্বাচন কমিশনের কাছে স্বচ্ছতা ও ইনসাফ আশা করে। তবে তারা এখনো কোনো ধরনের দায়িত্বহীন মন্তব্য ও আচরণ করেনি। জোটের পক্ষ থেকে উত্থাপিত অভিযোগের জবাব দিতে হবে নির্বাচন কমিশনকে। যেসব অনিয়মের অভিযোগ আনা হয়েছে উপযুক্ত তথ্যপ্রমাণ দিয়ে সেগুলো খণ্ডাতে হবে। কোনো অন্যায় হলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে কোনো ধরনের গোঁজামিলের আশ্রয় নেয়া ঠিক হবে না। রাজনৈতিক শীর্ষ নেতাদের নির্বাচনের ফল মেনে না নেয়ার সংস্কৃতি দেশের জন্য বারবার বিপর্যয় ডেকে এনেছে। যার জন্য বড় ধরনের মাশুল দিতে হয়েছে জনগণকে। নির্বাচন কমিশনকে বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। প্রতিষ্ঠানটি যদি অনিয়মের অভিযোগের বিশ্বাসযোগ্য সমাধান না করে তা হলে অনাস্থা ও অবিশ্বাস তৈরি করতে পারে।
গণতান্ত্রিক উত্তরণ একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। খেয়াল রাখতে হবে, আমরা ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে উঠে আসছি। এই উঠে আসাকে টেকসই করতে হলে প্রতিটি পক্ষকে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। বিচার মানি তালগাছ আমার— এ পুরনো সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আবারো যদি ক্ষমতার পুরনো বৃত্তে আটকে যায় বাংলাদেশ, তা হলে গণতন্ত্র শুরুতে হোঁচট খাবে।



