নোট ও গাইড বইয়ে রমরমা ব্যবসা, কিছু শিক্ষক আইন মানছে না

একটি জাতির উন্নতি ও সভ্য হওয়া নির্ভর করে তার প্রণীত শিক্ষাব্যবস্থায়। ইউরোপ-আমেরিকা এমনকি আমাদের নিকট-প্রতিবেশী পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো এর উত্তম উদাহরণ। তারা যেমন বৈষয়িক উন্নতি সাধন করেছে, একই সাথে শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিকশিত করতে পেরেছে টেকসই শিক্ষাব্যবস্থা প্রণয়ন করে। অথচ আমরা স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় পরও একটি টেকসই শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তি রচনা করতে পারিনি। অন্যান্য বিষয়ের মতো শিক্ষাকেও বাণিজ্য বানিয়েছি। কোটি কোটি শিক্ষার্থী একটি শ্রেণীর কাছে ব্যবসায়ের ক্লায়েন্ট। সে কারণে শিক্ষাদানের পরিবর্তে গাইড ও কোচিং বাণিজ্য বেশি জমজমাট।

নয়া দিগন্তে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজধানীর একটি বড় স্কুলে ছাত্রদের পাঠ্যপুস্তকের বাইরে বইয়ের আরেকটি তালিকা ধরিয়ে দেয়া হচ্ছে। নির্ধারিত কয়েকটি প্রকাশনীর গাইড ও নোট বই ওই তালিকায় স্থান পাচ্ছে। রীতিমতো নোটিশ দিয়ে ওই সব গাইড কিনতে বলা হচ্ছে। স্কুলে পাঠ্যবইয়ের মাধ্যমে মৌলিক শিক্ষা দেয়ার নিয়ম। শিক্ষকরা পাঠ্যবই থেকে পাঠদান করবেন। ছাত্ররা ক্লাসে শিক্ষকদের কাছে থেকে পড়া বুঝে নেবে।

গাইড বা নোট বই উপযুক্ত শিক্ষা গ্রহণে একপ্রকার বাধা সৃষ্টি করে, যেখানে বিস্তারিত পড়াশোনার বদলে সংক্ষিপ্ত নির্বাচিত কিছু অংশ শিক্ষার্থীদের পড়ার সুযোগ করে দেয়া হয়। এটি পাড়শোনায় ফাঁকিবাজি ছাড়া আর কিছু নয়। এতে আধেয় সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা অর্জিত হয় না, যে কারণে গাইড ও নোট বই নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, দেশে গাইড ও নোট বইয়ের রমরমা ব্যবসা থেমে নেই।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজধানীর একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৩০ সহস্রাধিক শিক্ষার্থী। ওই স্কুলের প্রতিটি ক্লাসে পাঠ্যপুস্তকের বিপরীতে নির্ধারিত প্রকাশনীর গাইড বা নোট বুকের তালিকা দিয়ে দেয়া হয়। ছাত্ররা সেই প্রকাশনী থেকে বইগুলো কিনতে অনেকটা বাধ্য হয়। এতে জড়িত আছেন স্কুলের শিক্ষক, প্রকাশনীর মালিকসহ একটি চক্র। শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা ভালো করতে না পারলেও ওই চক্র অর্থ কামিয়ে নিচ্ছে। এ প্রবণতা শুধু রাজধানীর একটি স্কুলে নয়, সারা দেশেই নোট-গাইড বিক্রির সিন্ডিকেট আছে। তারা নানাভাবে গাইড ও নোট বইয়ের প্রসার ঘটিয়ে অর্থ কামিয়ে নিচ্ছে।

স্কুলের যেসব শিক্ষক এর সাথে জড়িত তারা শিক্ষার্থীদের পাঠদানের বদলে নোট ও গাইড বই বিক্রির প্রতি বেশি মনোযোগী। রাজধানীর ওই স্কুলের শিক্ষকদের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ উঠেছে। অভিভাবকদের পক্ষ থেকে শিক্ষামন্ত্রীর কাছেও এ ব্যাপারে অভিযোগ দেয়া হয়েছে। এনসিটিবির আইনে স্পষ্ট বলা আছে— বোর্ড নির্ধারিত পাঠ্যপুস্তকের বাইরে অন্য কোনো পুস্তক কোনো বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ধারণ করতে পারবে না। বিদ্যালয়গুলো কঠোরভাবে এ আইন মেনে চললে সারা দেশে নোট ও গাইড বইয়ের রমরমা ব্যবসা চলতে পারত না।

পাঠ্যপুস্তকের ওপর নির্ভর পাঠদান নিঃসন্দেহে শিক্ষার মান বাড়াবে। এটি বাস্তবায়ন করতে হলে নোট ও গাইড বই প্রকাশ বন্ধ করতে হবে। খোদ শিক্ষকরা এ আইন না মানায় আমাদের বিদ্যালয়গুলোতে মানসম্পন্ন পাঠদান হচ্ছে না। এ ব্যবসায় থেকে শিক্ষকদের বিরত রাখতে হবে। সরকারের এ নিয়ে কঠোর হস্তক্ষেপ করা উচিত।