মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশী শ্রমিক নিয়োগে দীর্ঘদিন ধরেই জটিলতা চলছে। এ সমস্যার নিরসন করা যায়নি। দালাল বা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অভিবাসন-প্রত্যাশী শ্রমিকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ হাতিয়ে নেয়া, চাকরির ধরন নিয়ে প্রতারণা, নিয়োগকর্তার চাহিদামতো কর্মীর জোগান না দেয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রশাসনিক জটিলতার মতো সমস্যাগুলোর কোনোটিই বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ সমাধান করতে পারেনি। বছরের পর বছর কেটেছে, সরকারগুলো উপর্যুপরি আশ্বাসের বাণী শুনিয়ে নানা পদক্ষেপের ঘোষণা দিয়েছে; কিন্তু সমস্যা যে তিমিরে ছিল সেখানেই থেকে গেছে। এসব সমস্যার কারণে শ্রমিকরা আর্থিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, এখনো হচ্ছেন। মানবপাচার, সামাজিক সমস্যা ও অর্থপাচারের মতো নানা অপরাধমূলক ঘটনা ঘটেছে।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা-আইএলওর নীতিমালা অনুযায়ী, বিদেশী ও গৃহকর্মীদের ক্ষেত্রে অভিবাসন ব্যয় হওয়া উচিত এক মাসের মজুরির সমান। অথচ বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় কাজ পেতে বিপুল অর্থ আদায় করেছে দালালরা। জমিজমা, বাড়ির-ভিটা পর্যন্ত বিক্রি করে অনেকে বিদেশে গেছেন এবং প্রতারিত হয়েছেন। অনেকে নিঃস্ব হয়েছেন। অনেককে বনে-জঙ্গলে অমানবিক বন্দিজীবন কাটাতে হয়েছে, অনেকের মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু সরকারগুলো শ্রমিকদের রক্ষায় কিছুই করতে পারেনি।
সবাই জানে, বাংলাদেশে শ্রমিকদের অভিবাসনব্যবস্থা চরম দুর্নীতিগ্রস্ত। এর সাথে শুধু দালালই নয়, সংশ্লিষ্ট সরকারি দফতরের কর্মকর্তা, রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরাও জড়িত। সব সরকারের সময়ই এই খাতে দুর্নীতিই ছিল নীতি। এমতাবস্থায় নতুন আশাবাদের সঞ্চার করেছে মালয়েশিয়া সরকারের নতুন উদ্যোগ।
মালয়েশিয়ার সরকার নতুন নিয়োগপদ্ধতি চালু করতে যাচ্ছে। এ পদ্ধতিতে নিয়োগপ্রক্রিয়ায় এজেন্ট বা দালালের কোনো ভূমিকা থাকবে না। বিদেশী শ্রমিকদের সরাসরি নিয়োগ করা হবে। এ জন্য চালু করা হবে একটি ডিজিটাল ব্যবস্থা। সরকার থেকে সরকারভিত্তিক এই ব্যবস্থায় ডিজিটাল পদ্ধতির মাধ্যমে শ্রমিকের পরিচয় যাচাই, বেতন প্রদানসহ প্রশাসনিক কার্যক্রম চলবে। নিয়োগকর্তা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-সহায়ক ডিভাইসের মাধ্যমে সরাসরি শ্রমিকের সাথে কথা বলবেন এবং চুক্তির শর্তাবলি ঠিক করবেন।
উদ্যোগটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে। শ্রমিকের উৎস দেশগুলোর সাথে আলোচনার পাশাপাশি টেকসই ও নিরাপদ প্রযুক্তি কাঠামো তৈরির কাজ চলছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুন ব্যবস্থা কার্যকর হলে বিদেশী শ্রমিক নিয়োগে স্বচ্ছতা বাড়বে, খরচ কমবে এবং শ্রমিক শোষণ রোধ হবে। আমাদের বিশ্বাস, এতে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবে মালয়েশিয়া যেতে ইচ্ছুক বাংলাদেশের শ্রমিকরা। এখন পর্যন্ত দেশটিতে আট লাখের বেশি বাংলাদেশী শ্রমিক আছে। এদের সংখ্যা সে দেশে কর্মরত মোট বিদেশী শ্রমিকের প্রায় ৪০ শতাংশ। সেখানে বিদেশী শ্রমিকের চাহিদা যেমন দিন দিন বাড়ছে, তেমনি বাংলাদেশীদেরও বেশ চাহিদা আছে। নতুন ব্যবস্থায় বাংলাদেশীরা উপকৃত হবে— এটিই কাঙ্ক্ষিত। মন্দ লোকেরা নতুন কোনো কলাকৌশল উদ্ভাবন করে যাতে আবারো শ্রমিক শোষণের সুযোগ নিতে না পারে, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।
ভুললে চলবে না, প্রবাসী আয় আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা আহরণের দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎস। এ জন্য শুধু মালয়েশিয়া নয়, বিশ্বের সব শ্রমবাজারে শ্রমিক পাঠানোর প্রক্রিয়া স্বচ্ছ, দুর্নীতি ও প্রশাসনিক জটিলতামুক্ত করতে হবে। শ্রমিকদের যুক্তিসঙ্গত ব্যয়ে বিদেশে যাওয়া সবার আগে নিশ্চিত করা উচিত।



