দেশী-বিদেশী নানা ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত ব্যর্থ করে দিয়ে অবশেষে বহুল কাঙ্ক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচার শেষ হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৭টা থেকে প্রার্থীরা সব ধরনের নির্বাচনী প্রচার থেকে বিরত রয়েছেন। এখন ভোটের অপেক্ষা। সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বাংলাদেশ ইতিহাসের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এবারের নির্বাচনের বিশেষত্ব হলো— ফ্যাসিবাদী আদর্শে বিশ্বাসী দল আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না। দলীয়ভাবে আওয়ামী লীগ এবং পতিত সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা ও তার দোসররা দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছর ধরে ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর অবর্ণনীয় নিপীড়ন চালিয়েছেন। রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে বিরোধী নেতাকর্মীদের বিচারবহির্ভূত হত্যা-গুম করা হয়। একই সাথে বিপুল সংখ্যক বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মীর নামে গায়েবি মামলা দিয়ে জেলে পুরে রাখা হয়। সঙ্গত কারণে অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের সব কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছে। দল হিসেবে এটি আওয়ামী লীগের প্রায়শ্চিত্ত।
দেশী-বিদেশী পর্যবেক্ষকরা এখন পর্যন্ত নির্বাচনী পরিবেশ অনুকূল বলে মনে করছেন। নির্বাচনের পরিবেশ ইতিবাচক বলে গতকাল মঙ্গলবার জানিয়েছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নির্বাচন পর্যবেক্ষক দলের প্রধান ইভারস আইজাবস।
নির্বাচনী প্রচারকালে যে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ আশা করা হয়েছিল, তা পরিপূর্ণভাবে বজায় রাখতে পারেনি রাজনৈতিক দলগুলো। এর পেছনে যে কারণ কাজ করেছে, তা হলো— পুরনো ক্ষমতার চর্চা থেকে কিছু রাজনৈতিক দলের বেরিয়ে আসতে না পারার ব্যর্থতা। বিশেষ একটি দলের অন্তঃকোন্দল এবং ক্ষমতার জন্য অসুস্থ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হওয়ায় পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায়ও নির্বাচনী সহিংসতা হয়েছে। এতে করে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়নি।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) প্রতিবেদন মতে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরের ৩৬ দিনে সারা দেশে অন্তত ১৫ জন রাজনৈতিক নেতাকর্মী হত্যার শিকার হয়েছেন। অন্য দিকে, একটি সহযোগী দৈনিকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তফসিল ঘোষণার পর বিভিন্ন স্থানে ২৩৭টি সহিংস ঘটনা ঘটেছে। ১১ ডিসেম্বর তফসিল ঘোষণার পর থেকে সহিংস ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৭ জন। তবে সরকারের দাবি, এসব নিহতের ঘটনার মধ্যে রাজনীতি-সংশ্লিষ্টতা রয়েছে পাঁচটি হত্যাকাণ্ডে। এর মধ্যে তফসিল ঘোষণার ঠিক পরের দিন ১২ ডিসেম্বর ‘জুলাই আন্দোলনে’ উঠে আসা তরুণ নেতা ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি আততায়ীর গুলিতে নিহত হন।
কোনো হত্যা-সহিংসতা গ্রহণযোগ্য নয়। তাই এবারো যে হত্যা-সহিংসতার ঘটনা নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়নি— তা নতুন বাংলাদেশে বেদনার। কারণ, ফ্যাসিবাদী শাসনের পতনের পর দেশবাসীর প্রত্যাশা ছিল— ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতায় যাওয়ার আকাঙ্ক্ষী যেমন হবে, ঠিক তেমনিভাবে দায়িত্বশীল আচরণ করবে। শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে নিজ নিজ অবস্থান থেকে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে। রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মকাণ্ডে তার আন্তরিক প্রতিফলন ঘটেনি।
আমরা মনে করি, নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ করতে সব পক্ষকে সংযমী হয়ে সর্বোচ্চ দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে। কারণ, এবারের নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়ার ওপর নির্ভর করছে আগামী বাংলাদেশের ভাগ্য। দেশ কী সামনের দিকে যাবে, না যে তিমিরে আছে সেখানে আটকে থাকবে।



