অর্থনীতির ধকল কাটিয়ে ওঠা যায়নি, আশার জায়গা সুশাসন

সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে হবে রাজনীতিকদেরই। আর দেশে স্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করতে পারলেই কেবল অর্থনীতির যাত্রাপথ সুগম হতে পারে।

আওয়ামী সরকারের সাড়ে ১৫ বছরের চোরতন্ত্রের সময় নির্বিচার লুটপাট, ব্যাংক খাতে নৈরাজ্য, পুঁজিবাজারে নজিরবিহীন কারসাজিসহ সার্বিক অব্যবস্থাপনায় অর্থনীতি ধ্বংসের কিনারে পৌঁছে যায়। নৈরাজ্যের সেই ধকল এখনো কাটিয়ে ওঠা যায়নি। এখনো স্বৈরাচারের কৃতকর্মে ভুগছে অর্থনীতির নানা খাতে। অভ্যন্তরীণের পাশাপাশি বিদেশী বিনিয়োগেও গতি আসেনি। ফলে কর্মসংস্থানে এর প্রভাব পড়েছে। মূল্যস্ফীতি সামান্য কমলেও এখনো সহনীয় নয়। তবে আশাবাদের একটি জায়গা তৈরি হচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার বিভিন্ন ইতিবাচক পদক্ষেপ নেয়ায়।

একটি সহযোগী দৈনিক অর্থনীতির সার্বিক চিত্র তুলে ধরে জানাচ্ছে, গত দেড় বছরে সরকারের পদক্ষেপে অর্থনীতিতে রক্তক্ষরণ বন্ধ হয়েছে। অর্থনীতির বৈদেশিক খাতে স্বস্তি ফিরেছে। রোধ হয়েছে অর্থনীতির নিম্নমুখী যাত্রা। ডলার-সঙ্কট কাটিয়ে ওঠায় টাকার মানে স্থিতি এসেছে। বিগত সরকারের সময়ে বৈদেশিক মুদ্রার নিট রিজার্ভ ১৭ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছিল। এখন তা বেড়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের পদ্ধতিতে হিসাব করলেও প্রায় ২৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। বিগত সরকারের শোধ করতে না পারা বৈদেশিক ঋণের বড় অংশ এর মধ্যে পরিশোধ করা হয়েছে। তারপরও এই রিজার্ভ রাখতে পারা নিঃসন্দেহে সরকারের বড় অর্জন। তবে মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমলেও এখনো ঝুঁকির পর্যায়ে রয়েছে। এখনো ৮ শতাংশের উপরে থাকায় দীর্ঘ সময় ধরে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমেনি; বরং বেড়েছে।

এই দেড় বছরে রেমিট্যান্স ও রফতানি আয় বেড়েছে। অন্য দিকে আমদানি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ডলারের প্রবাহ বৃদ্ধিতে সাম্প্রতিক সময়ে চড়া সুদে বৈদেশিক ঋণ গ্রহণের প্রবণতাও কমেছে। পতিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সময়ে আমদানির নামে ব্যাপকভাবে টাকা পাচার হচ্ছিল। বর্তমানে সেটি বহুলাংশে কমেছে। সব চেয়ে বড় কথা, অর্থনীতিতে শৃঙ্খলা ফেরানোর চেষ্টা চলছে। প্রভাবশালী গোষ্ঠীর হস্তক্ষেপ এবং রাজনৈতিক প্রভাব অর্থনীতির গতি রোধ করছে না। আসলে অর্থনীতির সুষ্ঠু বিকাশে শৃঙ্খলার বিকল্প নেই।

ধ্বংস করে ফেলা ব্যাংক খাতসহ সার্বিক অর্থনীতিতে এখন ব্যাপকভিত্তিক সংস্কার চলছে। সংস্কার সম্পন্ন করা গেলে সুফল আসবে বলে আশাবাদী কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে ইতোমধ্যে চলমান সংস্কারকাজের সুফল আসতে শুরু করেছে।

অর্থনীতির জন্য সবসময় একটি সুষ্ঠু ও আইনানুগ পরিবেশের দরকার হয়। ব্যবসাবাণিজ্য ও লেনদেনের সুষ্ঠু পরিবেশ না থাকলে অর্থনীতি এগোয় না। কিন্তু শুধু শৃঙ্খলা থাকলেই আর্থিক খাতে তা সুফল দেবে না। অর্থনীতি এগিয়ে নিতে সবচেয়ে বড় যে জিনিসটি দরকার তা হলো- সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের আস্থা। গত ১৫ বছরে যে আস্থার সঙ্কট তৈরি হয়েছে তা এখনো কাটেনি। কমেনি রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা; বরং আগামী নির্বাচন ঘিরে দেশ ক্রমে আরো অস্থির হয়ে উঠছে। পতিত ফ্যাসিবাদী দলটি আবারো হত্যা, খুনের রাজনীতি শুরু করেছে। জুলাই বিপ্লবের অন্যতম কণ্ঠস্বর ওসমান হাদিকে হত্যার মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে দলটির নতুন করে দেশ ধ্বংসের রাজনীতি। এ অবস্থা কাটিয়ে ওঠা অর্থনীতি-সংশ্লিষ্টদের পক্ষে সম্ভব নয়। দরকার ফ্যাসিবাদবিরোধী সব রাজনৈতিক শক্তির সম্মিলিত প্রয়াস।

সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে হবে রাজনীতিকদেরই। আর দেশে স্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করতে পারলেই কেবল অর্থনীতির যাত্রাপথ সুগম হতে পারে।