মোবাইল সেট নিবন্ধনে আপত্তি, শৃঙ্খলা ফেরাতেই হবে

আমরা আশা করব, ব্যবসায়ীদের শুভবুদ্ধির উদয় হবে। তারা পরিবর্তনের উদ্যোগে সহায়ক শক্তি হবেন।

মোবাইলফোন হ্যান্ডসেটের নিবন্ধন বা ন্যাশনাল ইক্যুইপমেন্ট আইডেন্টিফিকেশন রেজিস্টার (এনইআইআর) বাধ্যতামূলক করা হয় চলতি মাসের শুরুতে। এর ফলে অবৈধ, নকল ও নিম্নমানের হ্যান্ডসেট আমদানি বন্ধ হবে এবং কর ফাঁকি রোধ হবে। অবৈধ ফোন আর নেটওয়ার্কে ব্যবহার করা যাবে না।

এনইআইআরের কারণে অবৈধ, নকল ও চুরি যাওয়া মুঠোফোন শনাক্ত এবং নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হবে। এটি সারা দেশের ভোক্তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। অবৈধ আইএমইআই ব্যবহার বন্ধ হলে ফোন ক্লোনিং, প্রতারণা ও বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডও অনেকটা কমে যাবে। এতে মোবাইলফোনের গ্রাহক ও দেশীয় উৎপাদকরা উপকৃত হবেন।

গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্য আরো নিরাপদ থাকবে। অবৈধ ফোন বন্ধ হলে স্থানীয় মুঠোফোন প্রস্তুতকারকরা অপেক্ষাকৃত কম দামে সেট বাজারে আনতে পারবেন। তবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন কেবল অবৈধ আমদানিকারক ও বিক্রেতারা। এ জন্য মোবাইলফোনের ব্যবসায়ীরা প্রতিবাদ জানাচ্ছেন, আন্দোলন করছেন, এমনকি হামলা ভাঙচুরও করছেন। তাদের দাবির মুখে সরকার নিবন্ধনের সময় এক দফা পিছিয়েও দেয়। তবে গত ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত যেসব মুঠোফোন দেশের নেটওয়ার্কে চালু হয়েছে, সেগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে রেজিস্ট্রির বিষয়টি মেনে নেয় সরকার। অবিক্রীত যেসব ফোনের তালিকা ব্যবসায়ীরা বিটিআরসিতে জমা দিয়েছেন, সেগুলোও রেজিস্ট্রি করা হয়। প্রবাসীদেরকে তাদের ব্যবহৃত ফোনের পাশাপাশি দু’টি নতুন হ্যান্ডসেট দেশে আনার সুযোগ দেয়া হয়। সেগুলোর নিবন্ধনের জন্য তিন মাস সময়ও দেয়া হয়।

একই সাথে অবৈধ হ্যান্ডসেটও আইনি কাঠামোর আওতায় আনার সুযোগ দেয়া হয়। আর বৈধভাবে আমদানি করা মুঠোফোনের ওপর শুল্ক ৬০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪৩ দশমিক ৪ শতাংশ করা হয়।

এত কিছুর পরও মোবাইল হ্যান্ডসেট ব্যবসায়ীরা সন্তুষ্ট নন। তারা প্রতিবাদ করেই যাচ্ছেন। হামলা, ভাঙচুর চালিয়ে যাচ্ছেন। এমনকি টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) কার্যালয়ের ভেতরে ঢুকে ভাঙচুর করেন।

এনইআইআর ব্যবস্থার কারণে মুঠোফোন ব্যবহারকারী ও গ্রাহকের তথ্য আরো বেশি নিরাপদ হবে। মুঠোফোন শিল্পে শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও ভোক্তা সুরক্ষা নিশ্চিত হবে। এসব কারণে মোবাইলফোন ইন্ডাস্ট্রি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এমআইওবি) নেতারা সরকারের পদক্ষেপকে স্বাগত জানান।

দেশের মানুষ কম দামে মোবাইলসেট পাবেন, এতে সন্দেহ নেই। অবৈধ সেট বন্ধ হলে দেশের সাধারণ মানুষ উপকৃত হবে। দেশে এখন দেশী-বিদেশী মোট ১৮টি স্মার্টফোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান আছে। এদের মোট বিনিয়োগ তিন হাজার কোটি টাকার বেশি। এই খাতে ৫০ হাজার দক্ষ শ্রমিকের পাশাপাশি ডিলার, ডিএসআর, সার্ভিস ও খুচরা বিক্রয়সহ আরো প্রায় ৫০ হাজার মানুষের পরোক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। এ খাতে নিয়োজিতদের মধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশ নারীশ্রমিক।

স্মার্টফোন উৎপাদন ও বিপণনশিল্প থেকে সরকার প্রতি বছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কর, মজুরি ও ইউটিলিটি বিল আয় করছে। এর বিপরীতে অবৈধ সেটের কারণে বছরে সরকার প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারায়। কারণ প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকার স্মার্টফোনের বাজারের ৪০ শতাংশের বেশি অবৈধ সেটের দখলে। এমন নৈরাজ্যকর অবস্থা বছরের পর বছর চলতে পারে না।

দেশকে অনিয়ম-অব্যবস্থাপনা ও বিশৃঙ্খলার পুরনো অপসংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতেই হবে। এরই একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ মোবাইলফোনের এনইআইআর।

আমরা আশা করব, ব্যবসায়ীদের শুভবুদ্ধির উদয় হবে। তারা পরিবর্তনের উদ্যোগে সহায়ক শক্তি হবেন।