নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার সাদিপুর ইউনিয়নের গোলনগর এবং সনমান্দী ইউনিয়নের দৌলরদী গ্রামের ভেতর দিয়ে ব্রহ্মপুত্র নদ প্রবাহিত হওয়ায় আশপাশের সাত গ্রাম প্রাকৃতিকভাবে আলাদা। একটি স্থায়ী সেতুর অভাবে দুই পাড়ের মানুষের সরাসরি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন।
যোগাযোগ অব্যাহত রাখতে দৌলরদী, গোলনগর, কুমারচর, জোয়ারদী, মুছারচরসহ আশপাশের সাত গ্রামের বাসিন্দারা প্রতি বছর চাঁদা তুলে শুষ্ক মৌসুমে সাঁকো নির্মাণ করেন। চাঁদা তুলে স্থানীয়দের সাঁকো নির্মাণ তাদের সামাজিক সংহতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তবে অস্থায়ী এ ব্যবস্থা কোনোভাবে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়।
সাত গ্রামের হাজারো মানুষকে প্রতিদিন শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষিকাজ, ব্যবসায়-বাণিজ্য এবং নিত্যপ্রয়োজনে নদী পারাপার হতে হয়। অথচ সরাসরি যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবে তাদের জীবনযাত্রা দুর্ভোগের চক্রে পড়েছে। একটি সেতুর অভাবে ওই সাত গ্রামের মানুষ কিভাবে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন তা নয়া দিগন্তের প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।
সোনারগাঁয়ের ওই গ্রামগুলোতে প্রায় ২০ হাজার মানুষের দৈনন্দিন জীবন একটি ঝুঁকিপূর্ণ বাঁশের সাঁকো ও নৌকার ওপর নির্ভরশীল হয়ে থাকবে, তা হতে পারে না। বাস্তবতা অস্বীকার করারও কোনো সুযোগ নেই। তিন যুগ ধরে ব্রহ্মপুত্র নদে একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণের প্রতিশ্রুতি রাজনীতিবিদরা দিয়েই যাচ্ছেন। উন্নয়নের এই প্রতিশ্রুতি রীতিমতো প্রহসনে রূপ নিয়েছে।
বর্ষায় সাঁকো পানিতে তলিয়ে গেলে নৌকা হয়ে ওঠে একমাত্র ভরসা। আর প্রতিকূল আবহাওয়া, নদীর স্রোত এবং নিরাপত্তাহীনতায় পারাপারে প্রতিনিয়ত ঝুঁকি তৈরি হয়। এতে শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যাতায়াত ব্যাহত হয়, রোগীদের জরুরি চিকিৎসাসেবা পেতে বিলম্ব ঘটে। কৃষিপণ্য বাজারজাত করতে প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়। সামাজিক জীবনেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। সেতু না থাকায় বাইরের অনেক পরিবার উল্লিখিত সাত গ্রামের কারো সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক গড়তে সাতপাঁচ ভাবেন।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অবকাঠামোগত উন্নয়নের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও সাত গ্রামবাসীর ভাগ্য বদলে একটি স্থায়ী সেতুর অভাব রীতিমতো বিস্ময়কর। এই সাত গ্রামের মানুষের জন্য একটি সেতু শুধু নদীর দুই পাড় সংযুক্ত করবে না; এটি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, কর্মসংস্থান এবং ব্যবসায়-বাণিজ্যের নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে।
সাত গ্রামবাসীর দুর্ভোগ লাঘবে আর কালক্ষেপণ নয়। জনপ্রতিনিধি, স্থানীয় সরকার বিভাগ, সড়ক ও জনপথ অধিদফতর এবং জেলা প্রশাসনের এজন্য সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। সম্ভাব্যতা যাচাই করে সেতু নির্মাণে দ্রুত প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে। আশ্বাস নয়, এবার বাস্তব পদক্ষেপ প্রয়োজন। সেতু নির্মাণ না হওয়া পর্যন্ত নিরাপদ ও নিয়মিত নৌযান ব্যবস্থার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় নিতে হবে।
উন্নয়নের সুফল তখনই অর্থবহ হয়; যখন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের জীবনমানে পরিবর্তন আসে। এজন্য সাত গ্রামবাসীর জন্য একটি সেতু নির্মাণ শুধু যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন নয়; তাদের সামগ্রিক জীবনধারায় ইতিবাচক পরিবর্তন।



