রাজবাড়ীতে মাজার ভাঙচুর, বিশৃঙ্খলা গ্রহণযোগ্য নয়

বর্তমানে দেশে বিশেষ রাজনৈতিক অবস্থা বিরাজ করায় নানা কায়দায় মতলবি গোষ্ঠী দাঙ্গা বাধিয়ে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে চায়। এরাই অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে চতুর্মুখী অপপ্রচারে লিপ্ত। এমতাবস্থায় কারো উসকানিতে সামাজিক শৃঙ্খলা ব্যাহত হয় এমন কাজ করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলায় কথিত ‘ইমাম মাহদী’ দাবিদার নুরুল হক ওরফে নুরাল পাগলার মাজার ভাঙচুর ও কবর থেকে তার লাশ তুলে অগ্নিসংযোগ করার ঘটনা শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের সাথে সাংঘর্ষিক।

গণমাধ্যমের খবর অনুসারে, গত ২৩ আগস্ট নুরাল পাগলার মৃত্যুর পর পরিবারের সিদ্ধান্তে নিজ বাড়ির সামনের অংশে দোতলা সমান (প্রায় ১২ ফুট উঁচু) একটি কাঠামোয় লাশ কবর দেয়া হয়। পরে কবরটি কাবা শরিফের আদলে রঙ করা হয়। একই সাথে ‘হজরত ইমাম মাহদী (আ:) দরবার শরিফ’ লেখা ব্যানার টাঙানো হয়। বিষয়টি স্থানীয় ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ সৃষ্টি করে। তারা কবর থেকে কাবা শরিফের আদলে করা রঙ পরিবর্তন, ‘ইমাম মাহদী (আ:) দরবার শরিফ’ লেখা সাইনবোর্ড অপসারণ এবং কবরের উচ্চতা কমিয়ে স্বাভাবিক করার দাবি জানান; কিন্তু নুরাল পাগলার পরিবার তাতে সময়ক্ষেপণ করলে গত শুক্রবার অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটি ঘটে।

কোনো মানুষের মৃত্যু হলে তার ইহাকালীন জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে। দুনিয়ার কারো সাথে তার আর কোনো লেনদেন থাকে না। তাই মৃতের প্রতি কোনো প্রকার রাগ, ক্ষোভ না রাখা মুসলিমমাত্র ধর্মীয় বিশ্বাস; কিন্তু নুরাল পাগলার মৃত্যুর পরেও তার প্রতি মানুষের ক্ষোভ ভাবনা জাগায় বৈকি। জীবদ্দশায় নুরাল পাগলার ইমাম মাহদী (আ:) দাবি এবং মৃত্যুর পর তাকে নিয়ে পরিবার ও অনুসারীরা যা করেছেন, তা মাত্রাতিরিক্ত বাড়াবাড়ি। সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মবিশ্বাসের বিপরীত। তাই বলে মৃতের লাশ কবর থেকে তুলে পোড়ানো সমর্থন যোগ্য নয়।

পতিত শেখ হাসিনার আমলে রাষ্ট্রীয়ভাবে মৃতের প্রতি ঘৃণার অপসংস্কৃতি গড়ে তোলা হয়। বরেণ্য মৃত ব্যক্তি নিয়ে গালিগালাজ করা ছিল মামুলি বিষয়। কিছু মানুষের মৃত্যুর পর তাদের লাশ নিয়ে হেনস্তা ও কবরে লাঠি দিয়ে আঘাতও করা হয়েছে। ফ্যাসিবাদী জমানায় মৃত ব্যক্তির প্রতি গড়ে ওঠা অপসংস্কৃতি চলতে পারে না। নতুন বাংলাদেশে সবার জন্য কল্যাণময় সংস্কৃতি বিনির্মাণ করতে হবে।

নুরাল পাগলার মৃত্যুর পর থেকে তাকে নিয়ে স্থানীয় মুসলমানরা তাদের দাবিগুলো প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে জানিয়েছেন; কিন্তু প্রশাসন বিষয়টি মীমাংসা করতে পারেনি, যা স্থানীয় প্রশাসনের ব্যর্থতা। প্রশাসন যদি শান্তিপূর্ণ সমাধানের ব্যবস্থা করতে পারত তা হলে এমন অঘটন হয়তো হতো না। আমরা লক্ষ করছি, দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় মাঠপ্রশাসনের কাজ কাঙ্ক্ষিত নয়।

বাংলাদেশে মাজার সংস্কৃতি বিদ্যমান একটি বাস্তবতা। আবার এটিও সত্য যে, অনেক মাজার মাদক সেবন এবং অসামাজিক কাজের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। এসব কারণে সাম্প্রতিক সময়ে কিছু মাজারের বিরুদ্ধে জনমানুষের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ দেখা গেছে। তবে এ কথা মনে রাখা জরুরি যে, মাজারকেন্দ্রিক যত অভিযোগ থাকুক না কেন, তা নিয়ে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করা যেতে পারে; কিন্তু বেআইনি কিছু সমর্থনযোগ্য নয়। কখনোই আইন নিজের হাতে তুলে নেয়া যাবে না।

বর্তমানে দেশে বিশেষ রাজনৈতিক অবস্থা বিরাজ করায় নানা কায়দায় মতলবি গোষ্ঠী দাঙ্গা বাধিয়ে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে চায়। এরাই অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে চতুর্মুখী অপপ্রচারে লিপ্ত। এমতাবস্থায় কারো উসকানিতে সামাজিক শৃঙ্খলা ব্যাহত হয় এমন কাজ করা থেকে বিরত থাকতে হবে।