সহযোগী একটি দৈনিকে দেশে তরল জ্বালানি মজুদ বেশ কমে যাওয়ার খবর দিয়েছে। স্বাভাবিক সময়ে দেশে যতটা জ্বালানি থাকার কথা, তার চেয়ে পরিমাণে বেশ কম আছে। দেশ এখন একটি বিশেষ সময় অতিক্রম করছে। অল্প কিছু দিনের মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের হাত থেকে একটি নির্বাচিত সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিতে যাচ্ছে। এ ধরনের একটি নাজুক সময়ে অত্যাবশ্যকীয় জ্বালানি ঘাটতি দেখা দিলে তা বিপদের কারণ হতে পারে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরে চলছে চরম অস্থিরতা, যা পরিস্থিতিকে আরো খারাপ করে দিচ্ছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) হিসাব মতে, বর্তমানে মাত্র সাত-আট দিনের তরল জ্বালানি মজুদ আছে। নিরাপত্তার জন্য ৪৫ দিনের ব্যবহার্য জ্বালানি মজুদ থাকার কথা। কিন্তু এই পরিমাণ মজুদ কখনো আমরা রাখতে পারিনি। এখন মজুদ কমে যাওয়ায় বলা হচ্ছে, নির্বাচনের বিশেষ মৌসুমে অতিরিক্ত ব্যবহার। দৈনিক যেখানে ১৫ হাজার টন ডিজেল ব্যবহার হওয়ার কথা, এখন ব্যবহার হচ্ছে ২১ হাজার টন। এ কারণে অন্যান্য তরল জ্বালানির ব্যবহারও বেড়েছে। নির্বাচনী মৌসুমে অধিক হারে যানবাহন ব্যবহৃত হওয়ায় দিনে অতিরিক্ত ছয় হাজার টন করে বেশি ডিজেল লাগছে। বাড়তি চাপে তরল জ্বালানির মজুদ অনেক কমে গেছে এ সময়ে।
পরিস্থিতি আরো খারাপ করে দিয়েছে বন্দরে উপর্যুপরি আন্দোলন, ধর্মঘট ও অস্থিরতা। এর আগে থেকে দেশে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সঙ্কটে ভোগছে। রান্নার কাজে ব্যবহৃত এলপিজি বাজার থেকে এক পর্যায়ে উধাও হয়ে যায়। গ্যাসের বোতলের দাম কয়েকগুণ পর্যন্ত বেড়ে যায়। এলপিজির সরবরাহ এখনো স্বাভাবিক হয়নি। অচিরে এর পর্যাপ্ত সরবরাহ পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। বাসাবাড়ির কাজে এলপিজির ব্যবহারকারীরা এখনো উচ্চ দামে তা কিনছেন। এর মধ্যে ডিজেল সঙ্কট হলে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ধাক্কা খাবে।
আশার কথা, নির্বাচনের আগেই ডিজেলের সরবরাহ নিয়ে বন্দরে জাহাজ ভেড়ার কথা রয়েছে। বন্দরের কার্যক্রম পুরোপুরি স্বাভাবিক রাখা গেলে প্রয়োজনীয় তরল জ্বালানি সরবরাহ পাওয়া যেতে পারে। উড়োজাহাজের জ্বালানি জেট ফুয়েল দেশে মজুদ রয়েছে সাত দিনের, ডিজেলের মজুদ আট দিনের, পেট্রল রয়েছে ১০ দিনের। সঠিক সময়ে আমদানি করা এসব জ্বালানি বন্দরে খালাস না হলে দৈনন্দিন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে এর প্রভাব পড়তে পারে। এ কাজে নিয়োজিত কর্তৃপক্ষকে তাই সাবধানী পদক্ষেপ নিতে হবে। বন্দর সচল রাখতে জোরদার তৎপরতা চালাতে হবে।
একটি দেশ অর্থনৈতিকভাবে কতটা উন্নত তা পরিমাপের অন্যতম একটি নির্দেশক হচ্ছে দেশটির জ্বালানি মজুদ। যেসব দেশ জ্বালানি নিরাপত্তা গড়ে তুলতে পেরেছে, সেসব দেশ উন্নত-সমৃদ্ধ হয়েছে। প্রাকৃতিক উৎস থেকে যথেষ্ট জ্বালানি সংগ্রহ না করেও অনেক দেশ জ্বালানি সরবরাহ নিরাপদ করে বিপুল উন্নতি করেছে। দুর্ভাগ্য আমাদের, আমরা দেশে প্রাকৃতিক জ্বালানি নিয়ে কার্যকর অনুসন্ধান চালাতে পারিনি। জ্বালানির জন্য আমরা পুরোপুরি আমদানিনির্ভর। আমরা এর নিরাপদ সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারিনি। দেশকে এগিয়ে নিতে হলে জ্বালানি সরবরাহ ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে টেকসই পরিকল্পনা থাকতে হবে। আগামীতে রাজনৈতিক সরকার এই কাজে আন্তরিক হবে— এ প্রত্যাশা সবার।



