শেয়ারবাজার বা পুঁজিবাজার মধ্যবিত্তের অর্থবিনিয়োগের একটি ক্ষেত্র, যেখানে সাধ্যমতো কম বা বেশি বিনিয়োগ করেও দুটো বাড়তি পয়সা উপার্জনের সুযোগ আছে। দেশের অর্থনীতির শক্তি বা দুর্বলতার প্রতিফলন ঘটে পুঁজিবাজারের মাধ্যমে। উন্নত দেশগুলোতে বড় ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম পুঁজিবাজার।
দেশে দীর্ঘদিন ধরে বিনিয়োগে স্থবিরতা চলছে। এ নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে উদ্বেগও আছে। শিল্প-কারখানা, ব্যবসাবাণিজ্যের বড় প্রকল্পে বিনিয়োগ হচ্ছে না। দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও দুঃশাসনে উদ্যোক্তারা ঝুঁকি নিতে চাননি। এখনো সেই পরিস্থিতি কাটেনি। মধ্যবিত্ত ও অবসরপ্রাপ্তদের নিরাপদ বিনিয়োগের আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত সঞ্চয়পত্রের বিনিয়োগও তলানিতে। ব্যাংকে আমানতের সুদ মূল্যস্ফীতির চেয়েও কম। আমানতের অর্থ ফিরে পাওয়া নিয়েও শঙ্কা আছে। তাই মানুষ ব্যাংকবিমুখ। জমি বা ফ্ল্যাট কেনায় বিনিয়োগ সবার পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ এতে বড় মূলধন দরকার। আছে প্রতারিত হওয়ার মতো ঝুঁকিও। অনেকের পক্ষেই সেই ঝুঁকি নেয়া সম্ভব হয় না। এমতাবস্থায় দেশের মধ্যবিত্ত মানুষের কাছে শেয়ারবাজার অর্থ বিনিয়োগের একটি বিকল্প ক্ষেত্র।
কিন্তু বাংলাদেশে পুঁজিবাজার বছরের পর বছর ধরে নানা সঙ্কটের মধ্য দিয়ে গেছে। স্বৈরাচারের আমলে এটিকে অর্থ লুটপাটের কেন্দ্রে পরিণত করা হয়। বড় ধরনের একাধিক সুপরিকল্পিত কারসাজির মাধ্যমে বিপুল অর্থ লুট করা হয়। এতে সাধারণ অনেক বিনিয়োগকারী নিঃস্ব হয়ে পড়েন। কেউ কেউ আত্মহত্যা করেন। বাজারের ওপর বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়। এখনো বাজারে অস্থিরতা, অসন্তোষ ও বিনিয়োগকারীদের অনাস্থা পুরোপুরি রয়ে গেছে। স্বৈরাচারের পতনের পর অনেকেই আশা করেছিলেন, বাজার স্বাভাবিক ধারায় ফিরবে। অন্তর্বর্তী সরকার কিছু দিকনির্দেশনা দিয়ে বাজারে গতি ফেরানোর চেষ্টা করে। তাতে খুব একটা কাজ হয়নি। ২০২৪ সালের ১৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার এমন ব্যক্তিকে চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয়, পুঁজিবাজার বিষয়ে যার অভিজ্ঞতা ছিল না। তার নেতৃত্বে যেসব সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে সেগুলো বাজারে স্বাভাবিক গতি ফেরাতে ইতিবাচক ফল দেয়নি; বরং অনেকগুলোই খামখেয়ালিপনা ও হঠকারিতার দৃষ্টান্ত বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। নতুন মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালা, মার্জিন রুলের মতো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন, আইপিও খরা, কমিশনের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ইত্যাদি বিভিন্ন কারণে পুঁজিবাজার ঘুরে দাঁড়ানোর পরিবর্তে এখন ধ্বংসের কিনারে উপনীত।
বাজার ধ্বংসের বিষয়টি স্বীকার করে নতুন সরকারের অর্থমন্ত্রী দ্রুত এ বাজার কার্যকর করার কথা বলেছেন। পুঁজিবাজার থেকে নেয়া অর্থে মুনাফা না করা পর্যন্ত সুদ মওকুফ করেছেন। তবে সরকারের পক্ষ থেকে এখনো সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। শুধু একজন উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারী নিয়োগ দেয়া হয়েছে।
পুঁজিবাজারে সুশাসন ফেরাতে হলে কমিশন অবিলম্বে পুনর্গঠন জরুরি।
পুঁজিবাজারের ব্রোকারদের সমিতির সভাপতি একটি দৈনিককে বলেছেন, বাজারের ওপর বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানোর জন্য এমন ব্যবস্থা করতে হবে যাতে বিনিয়োগ করে কেউ প্রতারণার শিকার না হন। নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে পুঁজির পূর্ণ নিরাপত্তা দিতে হবে।
পুঁজিবাজারে স্বচ্ছতা, দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে না পারলে এটি কখনোই ঘুরে দাঁড়াবে না।



