ইন্টারনেট সহজলভ্য হওয়ায় সহজ হয়ে এসেছে মানুষের জীবন। গতি বেড়েছে কাজের। কিন্তু এর কিছু অন্ধকার দিকও আছে। ইন্টারনেটে নীরব মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়েছে অনলাইন জুয়া বা গ্যাম্বলিং। গতকাল সহযোগী একটি দৈনিক পত্রিকার অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এর ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, রাতারাতি বড়লোক হওয়ার লোভে পড়ে অনলাইন জুয়ায় আসক্ত হচ্ছে মানুষ। সর্বস্বান্ত হচ্ছে তারা। এতে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে পারিবারিক কলহ, ডিভোর্স, চুরি-ছিনতাইÑ এমনকি আত্মহত্যার ঘটনাও। মাদকের চেয়েও ভয়ঙ্কর এই ডিজিটাল নেশায় আসক্ত হয়ে পড়ছে তরুণরা।
প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, এই সর্বনাশা চক্রের নেপথ্যে আছে দেশী-বিদেশী শক্তিশালী সিন্ডিকেট। চীন, নাইজেরিয়াসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিক রাজধানী ঢাকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এসব জুয়ার সাইট ও অ্যাপস নিয়ন্ত্রণ করছে। তাদের সহায়তা দিচ্ছে প্রযুক্তিজ্ঞানসম্পন্ন স্থানীয় চক্র। এরা কমিশনের বিনিময়ে যুবসমাজকে ফাঁদে ফেলছে। সবচেয়ে আশঙ্কার বিষয় হলোÑ দেশের কিছু মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস-এমএফএস তথা মোবাইল ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানের একশ্রেণীর অসাধু কর্মীও এই অপরাধচক্রে জড়িয়েছে। এদের মাধ্যমে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকা বিদেশে পাচার হচ্ছে। অর্থনীতিতে হচ্ছে রক্তক্ষরণ। অর্থনৈতিক নিরাপত্তায় হুমকি সৃষ্টি করছে।
জুয়ার সফটওয়্যার এমন মনস্তাত্ত্বিক কৌশলে ডিজাইন করা থাকে, যেখানে শুরুতে খেলোয়াড়কে সামান্য জয়ের মুখ দেখিয়ে প্রলুব্ধ করা হয়। মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, এই সাময়িক জয় মানুষের মস্তিষ্কের আনন্দকেন্দ্র দখল করে নেয়। তৈরি হয় বিভ্রম। এই বিভ্রম মাদকাসক্তির চেয়েও তীব্র। বারবার হেরে গিয়েও আসক্ত ব্যক্তিরা আগের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে মরিয়া হয়ে ওঠেন। বারবার অর্থ ঢালতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত সর্বস্ব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েন। নেশার টাকার জোগান দিতে কিশোর ও তরুণরা জড়িয়ে পড়ছে খুনের মতো জঘন্য অপরাধেও।
এই ভয়াবহ ডিজিটাল থাবা নির্মূলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী হিমশিম খাচ্ছে। সাইবার পুলিশ ও সিআইডি প্রতিনিয়ত অভিযান চালাচ্ছে। জুয়ার সাইট বন্ধ করছে। জড়িতদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। তবে মূল হোতারা দেশের বাইরে থাকায় এর শেকড় উপড়ে ফেলা যাচ্ছে না। তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রেও কিছু প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা আছে। জুয়ার সাথে মানিলন্ডারিংয়ের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক থাকলেও সিআইডি ছাড়া অন্য কোনো সংস্থার তদন্তের এখতিয়ার নেই। অথচ যে গতিতে জুয়ার বিস্তার ঘটছে, তা এক সিআইডির পক্ষে সামাল দেয়া প্রায় অসম্ভব। একই সাথে আমাদের বিদ্যমান আইনি দুর্বলতায় অপরাধীরা পার পেয়ে যায়।
এই নীরব মহামারী থেকে দেশকে বাঁচাতে হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তের পরিধি বাড়াতে হবে। পাশাপাশি মানিলন্ডারিং আইন ও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সময়োপযোগী করা জরুরি। বিটিআরসি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের গোয়েন্দা বিভাগকে জুয়ার সব ধরনের লেনদেন ও ওয়েবসাইট তাৎক্ষণিকভাবে ব্লক করতে হবে। মোবাইল ব্যাংকিং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের কর্মীদের ওপর কঠোর নজরদারি বাড়াতে হবে।
সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা ও পারিবারিক প্রতিরোধ। সন্তানদের ইন্টারনেট ব্যবহারের ওপর অভিভাবকদের নজরদারি বাড়ানোর বিকল্প নেই। জুয়ার কুফল সম্পর্কে গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার চালাতে হবে। যুবসমাজকে এই আত্মঘাতী পথ থেকে ফিরিয়ে আনতে রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবারকে সমন্বিতভাবে রুখে দাঁড়াতে হবে।



