সংগঠিত ডিজিটাল ব্ল্যাকমেইলিং

প্রতিরোধে সমন্বয় জরুরি

রাজনীতির মাঠে ডিজিটাল প্রোপাগান্ডা ঠেকাতে উদ্যোগী হতে হবে সব রাজনৈতিক দলকে। নিজ নিজ দলের কর্মীদের ডিজিটাল আচরণে দায়বদ্ধ করতে হবে। মোট কথা গুজব বা বিকৃত তথ্য প্রচার করে ফায়দা হাসিলের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। তথ্য যেমন শক্তি, অপতথ্য তেমনি ধ্বংসাত্মক অস্ত্র; তাই সরকারের পক্ষ থেকে শক্তিশালী সাইবার নজরদারি এবং প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধে প্রচার চালাতে হবে।

একসময় ডিজিটাল অপরাধ বা ব্ল্যাকমেইলিং ছিল বিচ্ছিন্ন ঘটনা; কিন্তু বর্তমানে কিছু সংগঠিত দল কাজটি করছে। এরা পেশাদার ডিজিটাল নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে। এ নেটওয়ার্ক হানা দিয়েছে রাজনীতির মাঠেও।

গতকাল এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে নয়া দিগন্ত। এতে জানানো হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে ব্যক্তিগত ছবি, ভিডিও বা তথ্য সংগ্রহ করছে চক্রগুলো। এসব তথ্য দিয়ে ঘায়েল করার চেষ্টা করা হচ্ছে সাধারণদের। দাবি করা হচ্ছে অর্থ। ব্ল্যাকমেইলের শিকার হচ্ছেন রাজনৈতিক ব্যক্তিরাও। এমনকি প্রধানমন্ত্রীর পরিবার এবং শীর্ষ নেতাদের নাম-পরিচয় ব্যবহার করেও বানানো হচ্ছে ভুয়া ফটোকার্ড। ছড়ানো হচ্ছে বিকৃত ভিডিও, মিথ্যা তথ্য। মানুষের গোপনীয়তাকে বানিয়ে তোলা হচ্ছে পণ্য। এগুলো কেবল অপরাধ নয়, আমাদের জাতীয় উদ্বেগেরও কারণ।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে বানানো হচ্ছে ‘ডিপফেক’ ভিডিও। করা হচ্ছে ভয়েস ক্লোন। রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি এবং জনমত বিভ্রান্ত করতেও ব্যবহার হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এসব ডিজিটাল কারসাজি করে সাইকোলজিক্যাল অপারেশন চালানো হচ্ছে। এগুলো তরুণ প্রজন্মের বিকাশে মারাত্মক বাধা সৃষ্টি করছে।

ভুক্তভোগীরা সাধারণত লোকলজ্জার ভয়ে মুখ খোলেন না। এই সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে অপরাধী চক্র। এ সঙ্কট মোকাবেলায় এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। এর জন্য কেবল আইন যথেষ্ট নয়। রাষ্ট্র, সমাজ ও রাজনৈতিক দলগুলোর সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে। ‘সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬’-এর কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। তদন্ত প্রক্রিয়াকে প্রযুক্তিগতভাবে আরো দক্ষ ও সংক্ষিপ্ত করা জরুরি, যাতে অপরাধীদের দ্রুত শাস্তির আওতায় আনা যায়। এতে ভুক্তভোগীদের মনে ভরসা তৈরি হবে।

ধীরে ধীরে দেশের প্রতিটি স্তরে, বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ‘ডিজিটাল লিটারেসি’ বাধ্যতামূলক করার দিকে এগিয়ে যাওয়া যেতে পারে। এতে তরুণদের জন্য সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য বুঝতে সহজ হবে। সেই সাথে ডিজিটাল কারসাজির বিষয়েও সচেতন হতে পারবে তারা। প্রতিটি থানায় আলাদা সাইবার ইউনিট গঠন করা যেতে পারে। এতে ভুক্তভোগী নারীদের জন্য বিশেষ গোপনীয়তা রক্ষা করে অভিযোগ নেয়ার ব্যবস্থা থাকবে।

রাজনীতির মাঠে ডিজিটাল প্রোপাগান্ডা ঠেকাতে উদ্যোগী হতে হবে সব রাজনৈতিক দলকে। নিজ নিজ দলের কর্মীদের ডিজিটাল আচরণে দায়বদ্ধ করতে হবে। মোট কথা গুজব বা বিকৃত তথ্য প্রচার করে ফায়দা হাসিলের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। তথ্য যেমন শক্তি, অপতথ্য তেমনি ধ্বংসাত্মক অস্ত্র; তাই সরকারের পক্ষ থেকে শক্তিশালী সাইবার নজরদারি এবং প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধে প্রচার চালাতে হবে।

ব্যক্তি সচেতনতা, সামাজিক প্রতিরোধ ও আইনের শাসন- এই তিনের সমন্বয়ে ডিজিটাল ব্ল্যাকমেইলের গোড়া উপড়ে ফেলা সম্ভব। না হয় এই আধুনিক মারণাস্ত্র আমাদের ব্যক্তিগত ও জাতীয় নিরাপত্তাকে স্থায়ীভাবে হুমকিতে ঠেলে দেবে।