স্কুলে খেলাধুলা বাধ্যতামূলক

অথচ খেলার মাঠ নেই

শিশুদের ডিভাইস আসক্তি থেকে মুক্ত করতে এবং সুস্থ প্রজন্ম গড়ে তুলতে খুব দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। রাজউক ও দুই সিটি করপোরেশনকে সমন্বিত উদ্যোগ নিয়ে প্রতি ওয়ার্ডে অন্তত একটি করে খেলার মাঠ নিশ্চিত করতে হবে। নতুন কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা আবাসন প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষেত্রে খেলার মাঠের শর্ত পূরণ বাধ্যতামূলক করতে হবে। স্কুলের মাঠ যেন ছুটির পর ও ছুটির দিনেও এলাকার শিশুদের জন্য খোলা রাখা হয় সে ব্যবস্থা করতে হবে।

শিশুদের স্বাভাবিক বেড়ে ওঠার জন্য খেলার মাঠ অপরিহার্য। যেকোনো শহরে প্রতি আধা বর্গকিলোমিটার দূরত্বে একটি করে খেলার মাঠ থাকবে এটি প্রত্যাশিত। ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) গবেষণা বলছে, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের আয়তন অনুযায়ী মাঠ থাকা দরকার ৬১০টি। বাস্তবে আছে মাত্র ২৩৫টি। এর মানে, প্রয়োজনের তুলনায় অর্ধেক মাঠও নেই। রাজউকের পরিকল্পিত ঢাকা মহানগরীর ১২৯টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৪১টিতে মাঠ নেই।

অন্য দিকে জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক ঘোষণা দিয়েছেন, আগামী শিক্ষাবর্ষে স্কুলগুলোতে চতুর্থ শ্রেণী থেকে খেলাধুলা বাধ্যতামূলক হবে। পরীক্ষায় নম্বরও থাকবে। শিক্ষার্থীদের ‘ডিভাইস’ আসক্তি কমাতে এই উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তিনি। এ উদ্যোগ প্রশংসনীয়। কিন্তু ঢাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে যদি মাঠই না থাকে, তাহলে শিক্ষার্থীরা খেলবে কোথায়?

সরকারি তথ্য বলছে, রাজধানীর ৩৪২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ২৫২টির মাঠ নেই। খেলাঘরের এক সেমিনারের তথ্য, সারা দেশে ১০ হাজার ৭৪০টি স্কুলে খেলার মাঠ নেই।

আইসিডিডিআর,বি’র সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার স্কুলপড়ুয়া শিশুরা প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫ ঘণ্টা সময় কাটায় মুঠোফোন, ট্যাব বা কম্পিউটারে। এতে তাদের ঘুম কমে যাচ্ছে। ওজন বাড়ছে। চোখে সমস্যা হচ্ছে। পাশাপাশি তৈরি হচ্ছে মারাত্মক মানসিক সঙ্কট। এই আসক্তির জন্য কি কেবল শিশুরাই দায়ী?

আবাসন বাণিজ্যের কারণে ঢাকার খোলা জায়গাগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। বেসরকারি স্কুল গড়ে উঠছে আবাসিক ভবনে। এমনকি ভবনের গ্যারেজে। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেসব শিশু পড়ে, তাদের স্ক্রিনের দিকে ঝুঁকে পড়া অস্বাভাবিক নয়।

দুঃখজনক হলো, যে কয়েকটি মাঠ টিকে আছে, সেগুলোও শিশুদের নাগালের বাইরে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠগুলো ছুটির পর তালা মেরে রাখা হয়। ‘কিশোর গ্যাং’ বা মারামারির অজুহাত দেখানো হয়। আবার কোথাও ‘কর্তৃপক্ষের অনুমতি’র দোহাই দেয়া হয়।

মাঠের এই তীব্র সঙ্কটের পাশাপাশি আমাদের সামাজিক ও পারিবারিক পরিবেশও শিশুদের জন্য দিন দিন অবরুদ্ধ হয়ে উঠছে। মনস্তাত্ত্বিক নির্যাতন, অপুষ্টি, শিশুশ্রম এবং ধর্ষণের মতো সামাজিক ব্যাধি তো আছেই, তার ওপর ত্রুটিপূর্ণ শিক্ষাক্রম শিশুদের মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের পথ রুদ্ধ করে দিচ্ছে।

জাতীয় শিক্ষানীতিতে বলা আছে, শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে খেলার মাঠ ও শরীরচর্চার ব্যবস্থা করতে হবে। এই নীতি কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ।

শিশুদের ডিভাইস আসক্তি থেকে মুক্ত করতে এবং সুস্থ প্রজন্ম গড়ে তুলতে খুব দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। রাজউক ও দুই সিটি করপোরেশনকে সমন্বিত উদ্যোগ নিয়ে প্রতি ওয়ার্ডে অন্তত একটি করে খেলার মাঠ নিশ্চিত করতে হবে। নতুন কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা আবাসন প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষেত্রে খেলার মাঠের শর্ত পূরণ বাধ্যতামূলক করতে হবে। স্কুলের মাঠ যেন ছুটির পর ও ছুটির দিনেও এলাকার শিশুদের জন্য খোলা রাখা হয় সে ব্যবস্থা করতে হবে।