ইরানের সর্বোচ্চ নেতা খামেনিকে হত্যা, বৈশ্বিক আস্থা আরো হারাবে যুক্তরাষ্ট্র

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যৌথ হামলা চালিয়ে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যা করেছে। বাসভবনে পরিবারের কয়েক সদস্যসহ তিনি নির্মমভাবে প্রাণ হারান। ভেনিজুয়েলার পর ইরান আক্রমণের মধ্যে দিয়ে ট্রাম্পের অধীনে শক্তি ও দম্ভ প্রকাশের নতুন এক আমেরিকাকে দেখা যাচ্ছে। যেখানে আন্তর্জাতিক আইন কানুন ও নিয়মের কোনো বালাই নেই। এক ব্যক্তির ইচ্ছা শেষ কথা। এ নীতি চলমান বিশ্বব্যবস্থা তছনছ করে দেবে। আমেরিকার সাথে বিরোধ-দ্বন্দ্বে থাকা দেশগুলোর শাসকরা তাদের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য হবেন। এতে করে সংশয় অবিশ্বাস বাড়বে বিশেষ করে আমেরিকার প্রতি আস্থা তলানিতে ঠেকবে।

ইরানে হামলার জন্য ট্রাম্পের কাছে যুতসই যুক্তি নেই। তার পূর্বসূরি বুশ যখন ইরাকে হামলা চালান তখন দেশটির বিরুদ্ধে গণবিধ্বংসী অস্ত্র মজুদ রাখার মিথ্যা অভিযোগ করা হয়েছিল। ইরানে হামলার জন্য ট্রাম্প তিন কারণ বলছেন, এগুলো হলো বৈশ্বিক হুমকি মোকাবেলা, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা ও নৌবাহিনী ধ্বংস করা এবং দেশটির শাসক গোষ্ঠী পরিবর্তন।

বাস্তবতা হচ্ছে— ইরান কোনোভাবে বিশ্বের জন্য হুমকি হয়নি। তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা শান্তিপ্রিয় কোনো দেশের বিরুদ্ধে হামলায় ব্যবহৃত হয়নি। দেশটির নৌবাহিনীও পরদেশে অন্যায়ভাবে আক্রমণ করেনি। যেখানে এ সব ক’টি অভিযোগ যুক্তরাষ্ট্র ও তার সঙ্গী ইসরাইলের বিরুদ্ধে আছে। ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে অভিযান চালিয়ে ধরে নিয়ে এসে বিচারের মুখোমুখি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই ইরানের জন্য বড় হুমকি হয়ে আছে। বাণিজ্যিক অবরোধ আরোপ করে তেহরানের টুঁটি চেপে ধরে আছে। আর ওয়াশিংটনের মিত্র ইসরাইল বছরের পর বছর বেসামরিক ফিলিস্তিনিদের হত্যা করছে, বাড়িঘর থেকে উচ্ছেদ করে মাতৃভূমি থেকে তাড়িয়ে দিচ্ছে।

ইরানের শাসকশ্রেণী ও জনগণকে লক্ষ্য করে ট্রাম্প অত্যন্ত অবমাননাকর বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন। তাদের উৎখাত করে ইরানিদের স্বাধীন করার অশোভন আহ্বান জানিয়েছেন। ইসলামী বিপ্লবী বাহিনী (আইআরজিসি) আত্মসমসর্পণ না করলে সবাইকে হত্যার হুমকি দিয়েছেন। একটি সার্বভৌম দেশের প্রতি এ ধরনের অবজ্ঞা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য।

ইরানিদের আলোচনার টেবিলে সমঝোতার আভাস দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের এভাবে সর্বাত্মক হামলা ওয়াশিংটনকে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একেবারে অবিশ্বস্ত করে তুলবে। নতুন দফায় ক্ষমতায় এসে ট্রাম্প এমন অবিশ্বস্ত আচরণ আরো বেশ কয়েকবার করেছেন। ইতোমধ্যে আলোচনায় এসেছে কেবল রাজনৈতিক সুবিধা পেতে ভেনিজুয়েলা ও ইরানে আক্রমণ করা হয়েছে। ট্যারিফ ইস্যুতে সুপ্রিম কোর্টের কাছে ট্রাম্প ধরাশায়ী হয়েছেন। মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে দেশে তার জনপ্রিয়তা কমছে। ইরানে ভয়াবহ হামলা চালিয়ে তিনি জনগণের দৃষ্টি ফিরিয়ে জনপ্রিয়তা বাড়াতে চান। যেখানে বিদেশে আর সামরিক অভিযান না চালানোর নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছেন।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনিকে হত্যা বিশ্বের অন্য নেতাদের প্রতি আমেরিকার নতুন বার্তা। কেবল দেশীয় রাজনীতিতে সুবিধা পাওয়ার তুচ্ছ কারণে হাজার হাজার মানুষের প্রাণ কেড়ে নিতেও ট্রাম্পের বাধছে না তা-ও নজির স্থাপন করেছে। এতে করে সারা বিশ্বে যে অবিশ্বাস ও আস্থাহীনতা ছড়িয়ে পড়বে সেটি কোনোভাবে যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্য কোনো দেশের জন্য ভালো কিছু বয়ে আনবে না। যুক্তরাষ্ট্রের এই দানবীয় আচরণের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদ হওয়া জরুরি।