নিরপদ মাতৃত্ব নিয়ে ব্যক্তি ও সমাজিক পর্যায়ে উদাসীনতা আছে। সরকারের কার্যক্রমও এ নিয়ে সন্তোষজনক নয়। নয়া দিগন্তে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৫৪ শতাংশ প্রসূতির সন্তান প্রসব-পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বাড়িতেই মৃত্যু হয়। এদের বেশির ভাগই গর্ভাবস্থায় কমপক্ষে চারবার চিকিৎসাসেবা পাওয়ার যে নিয়ম সেটি পায় না।
১৯৯০ সালে দেশে সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে প্রতি লাখে ৫৭৪ জন প্রসূতির মৃত্যু হতো। পরের তিন দশকে এই সূচকের উন্নতি হয়েছে। প্রতি দশকে যথাক্রমে ২৫২, ১২৮ ও ২৯ জন করে মৃত্যু হয়েছে। বর্তমানে এই হার প্রতি লাখে ১৩৬ জন।
বাংলাদেশে মাতৃমৃত্যুর প্রধান কারণগুলো হলো- প্রসব-পরবর্তী রক্তক্ষরণ, গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপ, বাধাগ্রস্ত প্রসব ও সংক্রমণ। এর বাইরে বিভিন্ন রোগ আছে। যেমন-রক্তস্বল্পতা, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, থাইরয়েডের ভারসাম্যহীনতা। অন্য দিকে দেশে মাতৃমৃত্যুর হার না কমার পেছনে রয়েছে-জন্মহার বেড়ে যাওয়া, বাড়িতে প্রসবের প্রবণতা, নিয়ম অনুযায়ী চারবার বা তার বেশি অ্যান্টিনেটাল কেয়ার (এএনসি) না নেয়া।
জাতিসঙ্ঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে মাতৃমৃত্যুর হার প্রতি লাখে ৭০-এ নামিয়ে আনতে হবে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান মাতৃমৃত্যুরোধের যে অগ্রগতি তা এসডিজির কাক্সিক্ষত লক্ষ্য অর্জনে যথেষ্ট নয়।
বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে অনেক মেয়ের অল্প বয়সে বিয়ে হচ্ছে যারা শিক্ষার দিক থেকে অনগ্রসর। মাতৃত্ব সম্পর্কে তাদের পর্যাপ্ত যে জ্ঞান থাকা প্রয়োজন ছিল তা নেই। অনেকটা অজ্ঞতার মধ্যেই তারা তাদের সন্তান জন্ম দিয়ে থাকেন। এসব মেয়ের নিরাপদ মাতৃত্ব সম্পর্কে সচেতন করতে সরকারি ও বেসরকারি কর্মসূচি হাতে নেয়া দরকার।
গ্রামে নারীরা অদক্ষ ধাত্রীর সহযোগিতায় সন্তান জন্ম দিচ্ছেন। এটি বন্ধ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে চিকিৎসক কিংবা মিডওয়াইফের সেবা নিশ্চিত করা জরুরি। প্রয়োজনের তুলনায় বাংলাদেশে মিডওয়াইফ কম। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে মিডওয়াইফের ঘাটতি দ্রুত পূরণ করা প্রয়োজন। একই সাথে দেশের চাহিদা মোকাবেলায় মিডওয়াইফ তৈরি করা দরকার, যারা নারীর নিরাপদ সন্তান প্রসবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন।
নারীদের মধ্যে সন্তান প্রসবের জন্য একধরনের হাসপাতলভীতি পরিলক্ষিত হয়। নারীরা ভাবেন হাসপাতাল মানেই সিজার করে সন্তান প্রসব। সিজারের হার খেয়াল করলে তাদের এই ভীতি অমূলক নয়। এ ক্ষেত্রে হাসপাতালগুলোকেও অহেতুক সিজার করা থেকে বেরিয়ে এসে সাধারণভাবে সন্তান প্রসবের দিকে ঝুঁকতে হবে। এ জন্য হাসপাতালের বাণিজ্যিক প্রবণতাও দায়ী। হাসপাতালগুলোকে সেবার জন্য কার্যক্রম পরিচালনার নীতি নিতে হবে। এতে যেমন মানুষের অর্থ সাশ্রয় হবে তেমনি ভয়মুক্ত সন্তান প্রসবও নিশ্চিত করা যাবে।
দুর্গম অঞ্চলে নারীদের সন্তান প্রসবকালে হাসপাতালে নেয়ার প্রয়োজন হলে যথাসময়ে যানবাহন নিশ্চিত করা যায় না। প্রসূতি নারীর হাসপাতাল সেবার জন্য অ্যাম্বুলেন্স সেবা দেয়া অতীব জরুরি।
একজন প্রসূতির যে মর্যাদা আমরা তা দিতে পারছি না। পরিবার সমাজ সবাইকে তাদের প্রতি যত্নশীল হতে হবে। এ জন্য রাষ্ট্রকেও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে হবে।



