কৌতূহলের বশবর্তী হয়ে তরুণদের অনেকে আসক্ত হয়ে উঠছে অনলাইন জুয়ায়। সহজলভ্য স্মার্টফোন, সস্তা ইন্টারনেট এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আগ্রাসী বিজ্ঞাপন এমন ফাঁদে ঠেলে দিচ্ছে। এই ফাঁদ থেকে বের হওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে তাদের জন্য।
‘সহজে আয়’ বা ‘অল্প সময়ে ধনী হওয়ার’ প্রলোভন দেখিয়ে জুয়ার সাইটগুলো কূকৌশলে তরুণদের আকৃষ্ট করছে। একবার এ চক্রে ঢুকে পড়লে বেশির ভাগই আর ফিরে আসতে পারছে না।
নয়া দিগন্তে প্রকাশিত খবরে দেখা গেছে, দেশে অনলাইন জুয়ার বিস্তার উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে; হাজার হাজার সাইট বন্ধ করার পরও ভিপিএনের মাধ্যমে আবার সক্রিয় হয়ে উঠছে এসব অবৈধ প্ল্যাটফর্ম। এতে শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, বরং জাতীয় অর্থনীতিও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রতি বছর বিপুল অঙ্কের অর্থ পাচার হয়ে যাচ্ছে বিদেশে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই আসক্তি তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য বিপর্যস্ত করে তুলছে। পড়াশোনায় অনীহা, পরিবারে অশান্তি, ঋণগ্রস্ততা, এমনকি আত্মহত্যার প্রবণতাও বাড়ছে। অভিভাবকদের অসহায়ত্ব এবং সন্তানের অস্বাভাবিক আচরণ এ সমস্যার গভীরতা আরো স্পষ্ট করে। বিশেষ করে ঈদের ছুটিতে এ প্রবণতা আরো বেশি দেখা গেছে। শহর থেকে গ্রামে ফিরে অনেক তরুণ অবসর সময় কাটানোর নামে অনলাইন জুয়া ও বেটিংয়ে জড়িয়ে পড়েছে। পারিবারিক মিলনমেলার আনন্দ পেছনে ফেলে তাদের সময় নষ্ট করতে দেখা গেছে ভার্চুয়াল জগতে। বন্ধুদের প্ররোচনায় নতুন করে অনেকে এ ফাঁদে পা দিচ্ছে, যা পরবর্তীতে ভয়াবহ আসক্তিতে রূপ নেয়।
অনলাইন জুয়া এখন আর কেবল ব্যক্তিগত সমস্যা নয়; এটি একটি বিস্তৃত সামাজিক, অর্থনৈতিক ও নৈতিক সঙ্কটে পরিণত হয়েছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে প্রয়োজন সমন্বিত ও কার্যকর উদ্যোগ। এ ক্ষেত্রে পরিবারকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে; সন্তানের অনলাইন কার্যক্রমে নজরদারি বাড়াতে হবে অভিভাবকদের। তাদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা সহজে নিজের সমস্যার কথা বলতে পারে। রাষ্ট্রকে আরো কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ করতে হবে। অবৈধ জুয়ার সাইটগুলো স্থায়ীভাবে বন্ধ করা, ভিপিএনের অপব্যবহার রোধ এবং জুয়ার সাথে জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা জরুরি হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জুয়ার বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণেও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সচেতনতামূলক কর্মসূচি চালু করা প্রয়োজন, যাতে তরুণরা বুঝতে পারে অনলাইন জুয়া কোনো আয় নয়, বরং এটি একটি ঠাণ্ডামাথার প্রতারণা। তাদের বিকল্প বিনোদন যেমন- খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং সৃজনশীল কাজে সম্পৃক্ত করতে হবে। সেইসাথে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোও জরুরি। কারণ বেকারত্ব ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা তরুণদের দ্রুত ধনী হওয়ার প্রলোভনে জুয়ার দিকে ঠেলে দেয়।
এ ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত সচেতনতা সবচেয়ে বড় শক্তি। সময়ের সঠিক ব্যবহার, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং সুস্থ জীবনধারার চর্চা তরুণদের এ ভয়াবহ আসক্তি থেকে দূরে রাখতে পারে। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র একযোগে এগিয়ে এলে অনলাইন জুয়ার অন্ধকার থেকে তরুণ প্রজন্মকে আলোর পথে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।



