গৃহকর্মীর ছদ্মবেশে অপরাধীচক্র, সতর্ক থাকতে হবে

খুন, চুরি ও পরিকল্পিত প্রতারণা থেকে নগরবাসীকে রেহাই পেতে হলে আদালতের আদেশ ও পুলিশের নির্দেশনা মানতে হবে।

অপরাধীরা তাদের অপরাধকর্ম সম্পাদনের জন্য নিত্যনতুন ফন্দি আঁটে। আর এতে সচেতনতার অভাবে বেকায়দায় পড়ে সাধারণ মানুষ। কখনো কখনো বড় ধরনের ক্ষতিও হয় তাদের। রাজধানীতে সম্প্রতি গৃহকর্মীর ছদ্মবেশে অপরাধীচক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে। মোহাম্মদপুরের একটি বাসায় গত ৮ ডিসেম্বর মা ও মেয়ে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। এ ঘটনায় প্রধান সন্দেহভাজন আসামি ওই বাসার গৃহকর্মীকে গ্রেফতার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এর পর থেকেই গৃহকর্মী নিয়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

রাজধানীর অনেক ব্যস্ত মানুষ গৃহকর্মী দিয়ে তাদের বাসার ঘর মোছা, রান্নাবান্না ও স্বজনকে দেখাশোনার কাজ করান। এ ছাড়াও অনেকে তাদের সন্তানকে স্কুলে নেয়া ও আনার কাজটিও গৃহকর্মীর মাধ্যমেই করান। কিন্তু এসব সেবা নিতে গিয়ে গৃহকর্মীর ব্যক্তিগত তথ্য নেয়া কিংবা তার ওপর নজর রাখার যে প্রয়োজনীয়তা রয়েছে তা অনেকে খেয়াল করতে পারেন না। এই সুযোগে গৃহকর্মীরা বাসায় অপরাধে লিপ্ত হয়ে সহজেই পালিয়ে যাচ্ছে।

গোয়েন্দা সংস্থার বরাতে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গৃহকর্মীর ছদ্মবেশে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে বাসাবাড়ির তথ্য সংগ্রহ করছে একটি সঙ্ঘবদ্ধ অপরাধী চক্র। তাদের সহায়তা করছে বিভিন্ন বাসার দারোয়ান ও কেয়ারটেকাররা। অপরাধে জড়িতরা গৃহকর্মী হিসেবে অল্প সময়ের জন্য একাধিক বাসায় কাজ নেয়। কোথায় সিসি ক্যামেরা নেই, কোন বাসা দিনের বড় সময় ফাঁকা থাকে, শিশু বা বৃদ্ধ কারা থাকেন- এসব তথ্য সংগ্রহ করে। পরে সংঘটিত হচ্ছে খুন, চুরি ও পরিকল্পিত লুটপাট।

গৃহকর্মীদের এসব অপরাধ নতুন নয়। মোহাম্মদপুরে মা ও মেয়ে হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার আগে ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোডে নিজ বাসায় খুন হন ইডেন মহিলা কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ মাহফুজা চৌধুরী পারভীন। ওই হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই গৃহকর্মী নিয়োগে সতর্কতার বিষয়টি আলোচনায় আসে। ২০২০ সালে মাহফুজা চৌধুরী পারভীন হত্যা মামলার রায়ে আদালত গৃহকর্মী নিয়োগে ৬ দফা নির্দেশনা দেন। এর মধ্যে রয়েছে নিয়োগের প্রথম ৯০ দিন সতর্ক পর্যবেক্ষণ, গৃহকর্মীর জীবনবৃত্তান্ত ও ছবি থানায় জমা, বাসার মূল প্রবেশপথে সিসি ক্যামেরা স্থাপন, গৃহকর্মী সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্সের আওতায় আনা এবং নিবন্ধিত গৃহকর্মীদের তথ্য থানায় সংরক্ষণ। কিন্তু অনেকে আদালতের এসব নির্দেশনা না মেনেই গৃহকর্মী নিয়োগ দেন।

এ ছাড়াও ২০২২ সালে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) গৃহকর্মী নিয়োগে ১৪ দফা নির্দেশনা জারি করে। ডিএমপির নির্দেশনার মধ্যে রয়েছে, গৃহকর্মী নিয়োগের আগে জাতীয় পরিচয়পত্র, সদ্য তোলা ছবি, শনাক্তকারী ব্যক্তি ও তার পরিচয় সংগ্রহ করা, পূর্ব কর্মস্থল ও কাজ ছাড়ার কারণ যাচাই, নিয়োগের পর গৃহকর্মীর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ, বাসার প্রবেশপথে সিসি ক্যামেরা স্থাপন, মূল্যবান জিনিস গোপন রাখা, শিশুদের একা না রাখা, সন্দেহজনক আচরণ নজরে রাখা এবং মানবিক আচরণ নিশ্চিত করা।

আদালতের নির্দেশনার মতো ডিএমপির এসব নির্দেশনাও অনেকে জানেন না। জানা থাকলেও অনেকে মানেন না। ফলে গৃহকর্মী সংশ্লিষ্ট অপরাধ চলছেই। চলতি মাসেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গৃহকর্মী সংশ্লিষ্ট অন্তত পাঁচটি গুরুতর অপরাধের ঘটনা ঘটেছে। খুন, চুরি ও পরিকল্পিত প্রতারণা থেকে নগরবাসীকে রেহাই পেতে হলে আদালতের আদেশ ও পুলিশের নির্দেশনা মানতে হবে।