শিক্ষিত জনগোষ্ঠী ও কর্মসংস্থানের ব্যবধান, সংস্কারে চাই নীতিগত রূপরেখা

দেশে উচ্চশিক্ষিত বেকারের হার দিন দিন বাড়ছে। এ দিকে নিয়োগকর্তারা হাহাকার করছেন দক্ষ জনশক্তির অভাবে। এতে দেখা দিয়েছে দ্বিমুখী সঙ্কট। জাতীয় অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়নের জন্য এটি সতর্কবার্তা।

এ বিষয়ে নয়া দিগন্ত একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে বিভিন্ন গবেষণা ও পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়েছে। গবেষণা বলছে, স্নাতক ডিগ্রিধারীদের প্রায় অর্ধেক বেকার। এমন তথ্য কেবল উদ্বেগজনক নয়; বরং প্রশ্ন তোলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও। অন্য দিকে দক্ষ জনবলের অভাবে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো বিদেশী কর্মী নিয়োগে বাধ্য হচ্ছে। এতে প্রতি বছর বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে চলে যাচ্ছে। এক দিকে আমাদের তরুণরা বেকার থাকছে, সেই সাথে দক্ষতার ঘাটতি মেটাতে বিদেশীদের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

এ সঙ্কটের মূল কারণ, শিক্ষাব্যবস্থা ও কর্মক্ষেত্রের চাহিদার মধ্যে বিশাল ফারাক। প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষায় সেকেলে সিলেবাস, মুখস্থনির্ভর পরীক্ষা পদ্ধতি এখনো আমাদের শিক্ষার ভিত্তি, যেখানে বাস্তবমুখী শিক্ষার অভাব তীব্র। ফলে শিক্ষিত তরুণরা কর্মক্ষেত্রে অপ্রস্তুত হয়ে যাচ্ছেন।

কোন খাতে কী ধরনের দক্ষতা প্রয়োজন, ভবিষ্যতে কত জনবল লাগবে- এ তথ্যের আদান-প্রদান না থাকায় চাহিদা ও সরবরাহে অসামঞ্জস্য তৈরি হচ্ছে। সাথে যোগ হয়েছে শিক্ষকদের অনেকের ব্যবহারিক অভিজ্ঞতার অভাব। সেই সাথে শিক্ষার্থীদের অফিসিয়াল পরিবেশে কাজ বা ‘হোয়াইট কলার জবের’ প্রতি মাত্রাতিরিক্ত মোহ।

সব শিক্ষা যে সরাসরি কারিগরি বা কর্মমুখী হবে, বিষয়টি এমনও নয়। সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় দর্শন, গবেষণা, বিজ্ঞান, সাহিত্য, চিকিৎসা কিংবা নীতিনির্ধারণ- এসব ক্ষেত্রে উচ্চতর ও গভীর অ্যাকাডেমিক শিক্ষার প্রয়োজন আছে। একটি জাতির চিন্তাশক্তি, উদ্ভাবনী ক্ষমতা ও দীর্ঘমেয়াদি দিকনির্দেশনা গড়ে ওঠে এ উচ্চতর শিক্ষায়। তবে এ শিক্ষার লক্ষ্য বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হতে পারে না। উচ্চশিক্ষা মানে কেবল ডিগ্রি অর্জন নয়; এর সাথে দক্ষতা, বিশ্লেষণী ক্ষমতা এবং সমাজে অবদান রাখার সামর্থ্য যুক্ত থাকতে হয়।

এমন বাস্তবতায় নিয়মিত সিলেবাস আধুনিকায়ন, বাধ্যতামূলক ও ফলপ্রসূ ইন্টার্নশিপ, জাতীয় দক্ষতা ডেটাবেস, শিক্ষকদের ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রশিক্ষণ এবং ক্যারিয়ার ও সফট স্কিল ডেভেলপমেন্ট সেন্টার গঠন। এসব পদক্ষেপ বিলাসিতা নয়, সময়ের দাবি। এগুলো বাস্তবায়নে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকার, শিল্প খাতসহ সব পক্ষের উদ্যোগী ভ‚মিকা থাকতে হবে।

নতুন বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি মানুষের প্রত্যাশা ছিল অনেক। বিশেষ করে অচল ও বাস্তবতাবিচ্ছিন্ন ব্যবস্থাগুলোর মৌলিক সংস্কার চেয়েছিলেন দেশবাসী। শিক্ষা খাত ছিল সেই তালিকার শীর্ষে। শিক্ষা কেবল একটি খাত নয়; এটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের ভিত্তি। অথচ বর্তমান সরকারের সময়সীমা শেষের পথে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচন। এ সময়ের মধ্যে শিক্ষাব্যবস্থার আমূল সংস্কার বা কাঠামোগত পরিবর্তন বাস্তবসম্মত নয়। তাই বলে দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। এ সময়ে অন্তর্বর্তী সরকার অন্তত একটি পথনকশা দিয়ে যেতে পারে। নিতে পারে জাতীয় দক্ষতা জরিপের উদ্যোগ। শিক্ষা সংস্কারকে অগ্রাধিকার দিয়ে পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের জন্য একটি নীতিগত রূপরেখা তৈরি করা যেতে পারে।