ঈদযাত্রায় সক্রিয় অপরাধী চক্র

কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন

ঈদের আনন্দ যেন কোনোভাবে ম্লান না হয়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা থাকবে, তারা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে এ ধরনের উৎসবকেন্দ্রিক অপরাধপ্রবণতা চিরতরে নিয়ন্ত্রণে আনবে। কঠোরতা, দক্ষতা ও আন্তরিকতার সমন্বয়ে মানুষের ঈদযাত্রা নিরাপদ করা সম্ভব।

ঈদ আমাদের সবচেয়ে বড় উৎসব। এই উৎসব ঘিরে মানুষের আনন্দ, ব্যস্ততা ও ঘরমুখী যাত্রা বাড়ে। কিন্তু এ সময় সক্রিয় হয়ে ওঠে অপরাধী চক্রও। এবারের ঈদ সামনে রেখে যে চিত্র ফুটে উঠছে, তা উদ্বেগজনক। মহাসড়কে চলছে ডাকাতি, রাজধানীতে ছিনতাই, বাসাবাড়িতে হচ্ছে চুরি। পুনরুত্থান হয়েছে অজ্ঞান ও মলম পার্টির। এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং সংগঠিত ও পরিকল্পিত অপরাধপ্রবণতার ইঙ্গিত দেয়।

প্রতি বছর উৎসবের আগে অপরাধ বাড়ে, এটি বহুল পরিচিত বাস্তবতা। কিন্তু পরিচিত বলেই তা মেনে নেয়া যায় না। বছরের পর বছর একই ধরনের সতর্কতা, একই ধরনের নির্দেশনা থাকার পরও কিভাবে এই চক্রগুলো বারবার একই কৌশলে সক্রিয় হতে পারছে— সেটিই প্রশ্ন। বিশেষ করে মহাসড়কে ডাকাতি করে যাত্রীদের সর্বস্ব লুটপাট করা হচ্ছে। এটি শুধু সম্পদের ক্ষতি নয়, এতে ভেঙে পড়ছে জননিরাপত্তা। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মতো গুরুত্বপূর্ণ পথে যদি ‘ডেঞ্জার স্পট’ তৈরি হয়, তাহলে তা দেশের সামগ্রিক নিরাপত্তাব্যবস্থার জন্য অশনিসঙ্কেত।

রাজধানীর চিত্রও ভিন্ন নয়। গোয়েন্দা পুলিশের তথ্যানুযায়ী, ঢাকার আটটি ক্রাইম জোনে ৪৩২টি ছিনতাইপ্রবণ স্থান আছে। এসব স্পটে সক্রিয় প্রায় এক হাজার ছিনতাইকারী। এই পরিসংখ্যান কেবল সংখ্যা নয়, এটি নগরজীবনের ভঙ্গুর নিরাপত্তার প্রতিফলন। দুর্নীতি দমন কমিশনের একজন মহাপরিচালক পর্যন্ত রাস্তায় ছিনতাইয়ের শিকার হন, তখন সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ মাত্রা ছাড়ায়।

বিশেষভাবে উদ্বেগজনক হলো মলম পার্টি ও অজ্ঞান পার্টির পুনরাবির্ভাব। বহুদিন ধরেই এ ধরনের অপরাধ কম ছিল। এরা আবার সক্রিয় হয়ে উঠল কেন? এটি কি নজরদারির ঘাটতি, নাকি অন্য কিছু। প্রশ্নগুলোর উত্তর পাওয়া জরুরি। এ ধরনের অপরাধ শুধু সম্পদ লুট করে না, জীবনহানিরও শঙ্কা থাকে।

নতুন সরকারের জন্য বর্তমান সময় গুরুত্বপূর্ণ। দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই সামনে এসেছে বড় উৎসব। এ সময় আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাখা তাদের সক্ষমতার প্রথম বড় পরীক্ষা হতে পারে। শুধু টহল বাড়ানো বা চেকপোস্ট বসানোই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন গোয়েন্দা তৎপরতা জোরদার করা। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে আগাম ব্যবস্থা নেয়া। বিশেষ করে মহাসড়কগুলোতে সমন্বিত অভিযান, রাতে বাড়তি নজরদারি এবং প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো জরুরি। ছিনতাইপ্রবণ স্থানে সিসিটিভি মনিটরিং কার্যকর করা জরুরি। সাধারণ মানুষের জন্য নিরাপত্তা নির্দেশনা প্রচার করাও প্রয়োজন। বাসাবাড়ি ফাঁকা থাকার সুযোগে চুরির ঘটনা ঠেকাতে স্থানীয় থানা ও কমিউনিটি পুলিশিং জোরদার করা যেতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা। উৎসবের সময় দায়িত্ব পালন শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি মানুষের জীবনের নিরাপত্তার সাথে সরাসরি সম্পর্কিত।

ঈদের আনন্দ যেন কোনোভাবে ম্লান না হয়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা থাকবে, তারা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে এ ধরনের উৎসবকেন্দ্রিক অপরাধপ্রবণতা চিরতরে নিয়ন্ত্রণে আনবে। কঠোরতা, দক্ষতা ও আন্তরিকতার সমন্বয়ে মানুষের ঈদযাত্রা নিরাপদ করা সম্ভব।