পাবনা মেডিক্যালে নির্মাণকাজে অনিয়ম-দুর্নীতি

তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিন

উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম, বিল-ভাউচার জালিয়াতি, কাজের আগে অর্থ ছাড় কিংবা নিম্নমানের কাজের অভিযোগ দেশের বিভিন্ন খাতে প্রায়ই সামনে আসে। এসব ঘটনা কেবল রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় নয়; পাশাপাশি জনআস্থাও দুর্বল করে দেয়। এতে উন্নয়নকাজ বাধাগ্রস্ত হয়। স্বাস্থ্য খাতের ক্ষেত্রে এর প্রভাব আরো গভীর। এ খাতের প্রতিটি পাই-পয়সার সাথে জনস্বাস্থ্যের প্রশ্ন জড়িত। এ ধরনের অভিযোগ ওঠামাত্র সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের উচিত দ্রুত, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত পরিচালনা করা। তদন্তে অনিয়ম-দুর্নীতির প্রমাণ মিললে দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। পাবনা মেডিক্যালের ঘটনা এটি বলে দেয়, আমাদের দেশে সরকারি প্রকল্পে কার্যকর নজরদারির অভাব প্রকট।

স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে পাবনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ১০ তলা ভবনের জন্য ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে প্রায় ৩০০ কোটি টাকার মূল দরপত্র আহ্বান করা হয়। কাজ পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সাজিন কনস্ট্রাকশন। ২০২৭ সালে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও বর্তমানে ভবনটির শুধু ৯ তলার ছাদ ঢালাই সম্পন্ন হয়েছে। বাস্তবে বহুতল ভবনের মূল নির্মাণকাজ অসম্পূর্ণ থাকলেও অস্তিত্বহীন ও অনাবশ্যক ‘অবশিষ্টাংশ কাজের’ (রিমেইনিং ওয়ার্কস) দরপত্র আহ্বান করে প্রায় ২৭ কোটি ৪৫ লাখ টাকা লোপাটের অভিযোগ উঠেছে। নয়া দিগন্তে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দুর্নীতি-অনিয়মের এই তথ্য জানা গেছে।

নয়া দিগন্তের প্রতিবেদন বলছে, মূল ভবনের অবকাঠামো শেষ হওয়ার আগে চলতি বছরের ২৮ জানুয়ারি ‘অবশিষ্টাংশ কাজ’ হিসেবে ছয়টি নতুন দরপত্র আহ্বান করা হয়। এসব কাজ মূল দরপত্রের অংশ হওয়া সত্ত্বেও আলাদা দরপত্র দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। অথচ সরকারি কেনাকাটা বিধিমালা (পিপিআর) অনুযায়ী, কোনো চলমান বড় প্রকল্পের কাজ এভাবে ছোট ছোট ভাগে বিভক্ত করা আইনবহির্ভূত। কেনাকাটা-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদন এড়ানো এবং স্থানীয় পর্যায়ে কাজ ভাগবাটোয়ারা করতে প্রতিটি দরপত্র পাঁচ কোটি টাকার নিচে রাখা হয়।

নয়া দিগন্তে প্রকাশিত ‘পাবনা মেডিক্যাল কলেজে কাজ না করে ২৭ কোটি ৪৫ লাখ টাকা উত্তোলন’ শীর্ষক প্রতিবেদনে যেসব অভিযোগ উঠে এসেছে, সেগুলো অত্যন্ত গুরুতর। এসব অভিযোগ সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনা, প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং আর্থিক তদারকিতে ভয়াবহ দুর্বলতার ইঙ্গিত। অভিযোগগুলোর বিষয়ে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত তথ্য প্রকাশ্যে তুলে ধরা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কারণ কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ সম্পন্ন না করে বিপুল অঙ্কের অর্থ উত্তোলনের অভিযোগ উঠলে তা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের বিষয় থাকে না; বরং পুরো রাষ্ট্রীয় আর্থিক ব্যবস্থাপনার বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।

উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম, বিল-ভাউচার জালিয়াতি, কাজের আগে অর্থ ছাড় কিংবা নিম্নমানের কাজের অভিযোগ দেশের বিভিন্ন খাতে প্রায়ই সামনে আসে। এসব ঘটনা কেবল রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় নয়; পাশাপাশি জনআস্থাও দুর্বল করে দেয়। এতে উন্নয়নকাজ বাধাগ্রস্ত হয়। স্বাস্থ্য খাতের ক্ষেত্রে এর প্রভাব আরো গভীর। এ খাতের প্রতিটি পাই-পয়সার সাথে জনস্বাস্থ্যের প্রশ্ন জড়িত। এ ধরনের অভিযোগ ওঠামাত্র সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের উচিত দ্রুত, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত পরিচালনা করা। তদন্তে অনিয়ম-দুর্নীতির প্রমাণ মিললে দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। পাবনা মেডিক্যালের ঘটনা এটি বলে দেয়, আমাদের দেশে সরকারি প্রকল্পে কার্যকর নজরদারির অভাব প্রকট।

আমরা মনে করি, যেকোনো প্রকল্পের অগ্রগতি, অর্থ ছাড়, কাজের মান এবং বাস্তবায়নের তথ্য নিয়মিত জনসমক্ষে প্রকাশ করলে অনিয়মের সুযোগ অনেকাংশে কমে আসে। সঙ্গত কারণে পাবনা মেডিক্যাল কলেজ-সংক্রান্ত অভিযোগের দ্রুত, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত করে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। সুশাসনের স্বার্থে কোনো অভিযোগ যেন অন্ধকারে হারিয়ে না যায়, এটি নিশ্চিত করতে হবে।