নিজ দেশে উচ্চহারে সংখ্যালঘু নির্যাতনের মধ্যে ভারত সর্বদা বাংলাদেশের সংখ্যালঘু নির্যাতনের আঙুুল তোলে। এ ধরনের অভিযোগ আনায় দিল্লির নিশানা থাকে ঢাকাকে চাপে ফেলা। সংখ্যালঘু হিন্দুদের আধিকার আদায় কিংবা স্বার্থরক্ষায় এটি করে না ভারত। স্বাধীনতার পর থেকে সংখ্যালঘু নির্যাতন একটি কার্ড হিসেবে দিল্লি ঢাকার বিরুদ্ধে ব্যবহার করে এসেছে। ঢাকার পক্ষ থেকে নয়াদিল্লির এ অন্যায্য দাবিকে কখনো জোরালো প্রত্যাখ্যান করা হয়নি। একেবারে চুপচাপ থেকে ঢাকা অনেকটা দিল্লির আস্থাভাজন হতে চেয়েছে। এতে যে বাংলাদেশের জন্য কোনো ফায়দা আনেনি, সেটি দিবালোকের মতো স্পষ্ট। দিন পাল্টেছে, হাসিনা পালিয়ে সে দেশে আশ্রয় নেয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকার আগের অবস্থান থেকে সরে এসেছে। এই প্রথম ভারতে সংখ্যালঘু নির্যাতন নিয়ে ঢাকা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
গত রোববার ঢাকায় প্রেস ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র ভারতে চলা মুসলিম, খ্রিষ্টানসহ সে দেশে বিভিন্ন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা নিয়ে প্রথম মুখ খোলেন। উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা তাদের নৃশংসভাবে হত্যা, গণপিটুনি, নির্বিচারে আটক, ধর্র্মীয় অনুষ্ঠানে বাধাসহ নিষ্ঠুর সব নির্যাতন চালানোয় বাংলাদেশ উদ্বিগ্ন। মুখপাত্র বলেন, ওড়িষ্যায় মুসলিম যুবক জুয়েল রানা, বিহারে আতহার হুসেনকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। বাংলাদেশী সন্দেহে কেরালায় পিটিয়ে একজনকে হত্যা করা হয়। গত সপ্তাহে খ্রিষ্টানদের বড় দিন উপলক্ষে ভারতজুড়ে সংঘটিত সহিংসতায় বাংলাদেশ গভীরভাবে উদ্বিগ্ন বলে জানান তিনি।
সংখ্যালঘু নির্যাতন ভারতে রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে এক ধরনের সমর্থন সব সময় পেয়ে আসছে। বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর এর মাত্রা বেড়েছে। প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো হয় না। বাংলাদেশ কখনো এ নিয়ে ভারতের কাছে কৈফিয়ত চায়নি। দুর্ভাগ্য হলো- ভারত প্রতিনিয়ত সংখ্যালঘু নির্যাতন নিয়ে বাংলাদেশকে অভিযুক্ত করে। সেই অভিযোগের বেশির ভাগের ভিত্তি থাকে না। এমন অনেক ঘটনায় বাংলাদেশের কৈফিয়ত চেয়েছে, যেগুলো আদৌ সংখ্যালঘু নির্যাতন ছিল না। জমি-জিরাত নিয়ে বিরোধ, সন্ত্রাস-চাঁদাবাজি করতে গিয়ে জনরোষের শিকার হওয়া, এমনকি স্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনাকে সংখ্যালঘু নির্যাতন বলে দিল্লি বাংলাদেশের কাছে প্রতিকার চেয়েছে। ঘটনা পরিষ্কার হওয়ার পরও নিজেদের ভুলের জন্য ভারত কখনো ক্ষমা চায়নি। কখনো কৃত অন্যায় নিয়ে অনুতপ্ত নয় দিল্লি।
প্রতিবেশী দেশে সংখ্যালঘু মুসলিমদের ওপর যে হারে নির্যাতন চলে, তার প্রতিক্রিয়া বাংলাদেশে হওয়া স্বাভাবিক।
ভারতীয় গণমাধ্যম দ্য হিন্দুর ফ্রন্টলাইন ম্যাগাজিনকে এক সাক্ষাৎকারে গত পয়লা এপ্রিল সিপিডির ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, ভারত যখন বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের প্রতি আচরণ নিয়ে কথা বলে, তখন তাদের নিজের দেশে সংখ্যালঘুদের প্রতি আচরণের দিকে তাকাতে হবে। ভারতে সংখ্যালঘু নির্যাতনের প্রতিক্রিয়া বাংলাদেশে হওয়া স্বাভাবিক এমন ইঙ্গিত তিনি ওই সাক্ষাৎকারে দেন। বাস্তবে যদিও এমনটি খুব কম ক্ষেত্রে ঘটে।
সংখ্যালঘু নির্যাতনে রাষ্ট্রীয়ভাবে বাংলাদেশে সমর্থন নেই। এমনকি সমাজের কোনো অংশ থেকে এজন্য আশকারা দেয়া হয় না। এরপরও ভারত সংখ্যালঘু নির্যাতনের মিথ্যা অভিযোগে বাংলাদেশকে চাপ প্রয়োগ করে। বিগত সরকারগুলো ভারতের এমন অসততার প্রতিবাদ না করায় তারা এর সুবিধা নিয়েছে। হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর ভারত একে একটি অস্ত্র হিসেবে ক্রমাগত প্রয়োগ করেছে। অন্তর্বর্তী সরকার শেষ পর্যন্ত এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে শুরু করেছে। ভারতের অভ্যন্তরের সংখ্যালঘু নির্যাতন নিয়ে কথা বলেছে। এটি স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণের যাত্রা বলা যেতে পারে।



