জলাশয়ে নেই দেশী মাছ

অভয়ারণ্য নিরাপদ করুন

জলমহালে বিষ প্রয়োগ বা শুকিয়ে মাছ ধরার মতো অপরাধে জড়িতদের ইজারা বাতিল করতে হবে। কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে তাদের। প্রজনন মৌসুমে মা মাছ রক্ষায় অভয়াশ্রম ঘোষণা ও কার্যকর তদারকি বাড়াতে হবে। কারেন্ট জালের মতো সর্বনাশা ফাঁদ উৎপাদন, বিক্রি ও ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। আমরা আশা করি, দেশীয় মাছ রক্ষা করতে কার্যকর ভূমিকা পালন করবে সরকার। সেই সাথে সচেতন হবে জনগণ।

বর্ষায় বাংলাদেশের খাল-বিল, নদী-নালা আর প্লাবিত ধানক্ষেত থাকত দেশীয় মাছে ভরপুর। ধরা পড়ত শোল, গজার, কই, শিং ও মাগুর। পুঁটি, টেংরা আর খলসে মাছ পাওয়া যেত জলাশয়গুলোতে। কাদার নিচে লুকিয়ে থাকত গুতোম মাছ। নতুন পানি এলে গৃহস্থ ও জেলেদের ব্যস্ততা শুরু হয়ে যেত জাল, পলো আর চাঁই নিয়ে। অনেক সময় ঠেলাজালের এক ‘খেউ’ থেকে উঠে আসত একবেলা রান্না করার মতো মাছ। কিন্তু এখন সেই পরিস্থিতি নেই। গ্রামের লোকদের জন্যও মাছ যায় শহর থেকে!

গতকাল নয়া দিগন্তের প্রতিবেদনে পাবনার বিল ও জলাশয়গুলোর করুণ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। বর্ষা মৌসুমেও জেলার ১৬টি নদী ও শতাধিক বিল জলাশয়ে দেশীয় মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। এতে নির্ভর করতে হচ্ছে চাষের মাছের ওপর।

এই চিত্র কেবল পাবনার নয়; গোটা বাংলাদেশের। হাওর এলাকার জলাশয়গুলোরও একই অবস্থাÑ যেগুলো নিয়ে সংবাদমাধ্যমগুলোতে নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। চিহ্নিত এই সঙ্কট উত্তরণে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হয় না।

জলবায়ু পরিবর্তন ও উজানে বাঁধ দেয়ায় নাব্যতা হারাচ্ছে নদী। খাল ও বিলগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে। তারপর সেগুলো ভরাট হচ্ছে। এতে মাছের আবাস এবং প্রজনন ক্ষেত্র সঙ্কুচিত হয়ে যাচ্ছে। কৃষিজমিতে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক দেয়া হচ্ছে। শিল্প-কারখানার বিষাক্ত বর্জ্য জলাশয়ে মিশে বিল ও নদীর স্বাভাবিক ইকোসিস্টেম ধ্বংস করে দিচ্ছে। আবার অসাধু উপায়ে মাছ ধরার প্রবণতা ব্যাপক হারে বেড়ে যাচ্ছে। মাছ ধরতে ব্যবহার করা হচ্ছে কারেন্ট জাল, মশারি জালের মতো নিষিদ্ধ ফাঁদ।

তার চেয়েও আতঙ্কের বিষয় হলো- জলমহালে বিষ দিয়ে মাছ ধরা। অতিরিক্ত মুনাফার লোভে অনেক ক্ষেত্রে ইজারাদাররা জলমহালে বিষাক্ত রাসায়নিক ছিটিয়ে দিচ্ছে। মাছগুলো দুর্বল হয়ে পানির ওপর ভেসে উঠছে। এতে মাছ ধরা ইজারাদারদের জন্য সহজ হয়। কিন্তু ওই বিষাক্ত রাসায়নিকে বড় মাছগুলো ভেসে উঠছে ঠিক; কিন্তু পানির নিচে থাকা কোটি কোটি মাছের ডিম নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। চিরতরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে মাছের খাবারের উৎস। আবার বাণিজ্যিকভাবে হাইব্রিড মাছ চাষের জন্য দেশীয় কিছু মাছকে ‘রাক্ষুসে’ বিবেচনা করে বিষ দিয়ে মেরে ফেলার নজিরও আছে।

দেশীয় মাছ খেতে সুস্বাদু, পুষ্টিসম্পন্ন। এই মাছ জলজ জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশগত ভারসাম্য টিকিয়ে রাখে। দেশীয় মাছ টিকিয়ে রাখা আমাদের অস্তিত্বের জন্যই জরুরি। এর জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ এবং উদ্যোগ নিতে হবে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়কে। কেবল ‘সচেতনতামূলক মেলা’ বা কৃত্রিমভাবে কিছু প্রজাতির চাষ সম্প্রসারণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না তাদের।

জলমহালে বিষ প্রয়োগ বা শুকিয়ে মাছ ধরার মতো অপরাধে জড়িতদের ইজারা বাতিল করতে হবে। কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে তাদের। প্রজনন মৌসুমে মা মাছ রক্ষায় অভয়াশ্রম ঘোষণা ও কার্যকর তদারকি বাড়াতে হবে। কারেন্ট জালের মতো সর্বনাশা ফাঁদ উৎপাদন, বিক্রি ও ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। আমরা আশা করি, দেশীয় মাছ রক্ষা করতে কার্যকর ভূমিকা পালন করবে সরকার। সেই সাথে সচেতন হবে জনগণ।