দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো মানুষের চাহিদার আলোকে শিক্ষা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। ফলে এসব প্রতিষ্ঠান থেকে অভিভাবকদের অনেকেই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়পড়ুয়া শিশুশিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ গ্রাম-গঞ্জের প্রান্তিক পর্যায়ের। শহরাঞ্চলে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কিছুটা পড়াশুনা থাকলেও গ্রাম কিংবা দুর্গম অঞ্চলের স্কুলগুলোতে খুব নাজুক অবস্থা বিদ্যমান। প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার অভাবে এসব বিদ্যালয়ে শিক্ষকরা থাকতে চান না। ফলে শিক্ষার্থীরা বছরের পর বছর তাদের প্রাপ্য শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। গ্রাম-গঞ্জের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সরকারের বিশেষ কোনো উদ্যোগও নেই। যে কারণে এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা এক ধরনের দায়সারা প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে বড় হচ্ছে।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার রামকৃষ্ণপুর ও চিলমারী ইউনিয়নে পদ্মার চরের ২৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অনুমোদিত শিক্ষক পদ ১৫০টি। বর্তমানে সেখানে কর্মরত আছেন মাত্র ৮৫ জন। দীর্ঘদিন ধরে ৬৫টি শিক্ষক পদ শূন্য রয়েছে। অনেক স্কুলে প্রাক-প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত ছয়টি শ্রেণীর বিপরীতে মাত্র দুই থেকে তিনজন শিক্ষক রয়েছেন। কোথাও আবার একজন শিক্ষকই পুরো বিদ্যালয়ের পাঠদান সামলাচ্ছেন। এক শিক্ষকের পক্ষে একসাথে একাধিক শ্রেণীতে পাঠদান কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এর পাশাপাশি কর্মরত শিক্ষকদের একটি বড় অংশ ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করায় দাফতরিক কাজেই তাদের বেশির ভাগ সময় ব্যয় হচ্ছে।
নদী-বিধৌত বাংলাদেশে নদীকে উপেক্ষা করে থাকার সুযোগ নেই। কিন্তু নদী অঞ্চলে বাস করা মানুষকে উপেক্ষা করে তাদেরকে শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত করলে দেশের উন্নতিতেই বাধা হয়ে দাঁড়ায়। চরাঞ্চলে শিক্ষক না থাকার ঘটনা শুধু দৌলতপুরে নয়, সারা দেশের চরাঞ্চলেই এই সমস্যা বিদ্যমান। বছরে পর বছর গেলেও সরকার চরের শিক্ষার এই সঙ্কটটি উপেক্ষা করে যাচ্ছে।
শহরের মানুষের শিক্ষা নিয়ে সরকার যতটা সচেতন থাকে, গ্রাম কিংবা চরাঞ্চলের মানুষের শিক্ষা নিশ্চিত করতে তার কিয়দংশও দেখা যায় না। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোক্তারাও চরাঞ্চলের মানুষের মানসম্মত শিক্ষা বিস্তারে কোনো পদক্ষেপ নেন না। চরাঞ্চলের মানুষের প্রতি এটি এক প্রকার বৈষম্য।
আমাদের দেশে নদী-তীরবর্তী অঞ্চলে বাস করা মানুষের দুঃখের কোনো সীমা থাকে না। চরাঞ্চলের মানুষের শিক্ষাসহ জীবন-মানোন্নয়নে সরকারের বিশেষ নীতি-কৌশল গ্রহণ করতে হবে।
চরাঞ্চলে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে বিশেষ কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। এর মধ্যে যেসব অঞ্চল বেশি দুর্গম সেগুলোতে বোর্ডিং স্কুল স্থাপন করা যায়। সরকারি-বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে তা সম্পন্ন করা যেতে পারে।
চরাঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে শিক্ষকদের অনীহা থাকবে, তা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু সেখানে যাতে শিক্ষকরা পাঠদানে ইচ্ছুক হয়ে উঠেন সে ব্যাপারে সরকারের বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। সরকারকে দুর্গম অঞ্চলের শিক্ষকদের বিশেষ সুবিধা দিতে হবে।
আমরা আশা রাখি, দৌতলপুরের চরাঞ্চলে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকসঙ্কট দূর করতে সরকার স্বল্প সময়ের মধ্যে বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। একই সাথে দেশের সব দুর্গম অঞ্চলের প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নে সরকার আলাদাভাবে নজর দেবে।



