বিগত কয়েক দশকে ধারাবাহিকভাবে দেশের জনসংখ্যার একটি অংশ দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র থেকে বেরিয়ে এসেছিল। কিন্তু এই ধারাবাহিকতায় ছেদ পড়েছে। গত তিন-চার বছর ধরে ফের বাড়তে শুরু করেছে দারিদ্র্যের হার। যদিও এ সময়ে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বাজেট বরাদ্দ বিপুল বেড়েছে। সঙ্গত কারণে প্রশ্ন উঠেছে, এর কার্যকারিতা নিয়ে। এ খাতে রাজনৈতিক প্রভাবে বিপুল দুর্নীতির খবর আগে থেকেই আছে। সামাজিক সুরক্ষার নামে বরাদ্দ খাতগুলো বিচার-বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই বরাদ্দকৃত অর্থের বড় একটি অংশ চলে যাচ্ছে অন্য খাতে। ফলে দারিদ্র্য-বিমোচনের আসল উদ্দেশ্য অর্জিত হচ্ছে না।
২০২৫-২৬ সালের বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা খাত যাচাই করলে বোঝা যাবে, এই অর্থ মোটাদাগে কোথায় খরচ হচ্ছে। বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ ছিল এক লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকার বেশি। যা মোট বাজেটের প্রায় ১৫ শতাংশ। এ বিপুল অর্থ সত্যিকার অর্থে সামাজিক সুরক্ষায় ব্যবহার হলে পরিস্থিতি আমূল পাল্টে যাওয়ার কথা। আসলে এতে শুভঙ্করের ফাঁকি রয়ে গেছে। যেমন উল্লিখিত খাতে বরাদ্দ অর্থের ২৫ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা ব্যয় হয় সরকারি চাকরিজীবীদের পেনশনে। সরকারি চাকরিজীবীরা সাধারণ সচ্ছল। এমনকি তাদের মধ্যে সমাজের উচ্চবিত্ত আছেন। একই সাথে মুক্তিযোদ্ধা ভাতা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তাদের ভর্তুকির অর্থ এই খাত থেকে দেয়া হয়।
অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত একটি টাস্কফোর্স যাচাই করে দেখেছে, ২১টি খাত সামাজিক নিরাপত্তার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যার সাথে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কোনো সম্পর্ক নেই। শেখ হাসিনা সরকারের সময় জয়িতা ফাউন্ডেশন ভবন নির্মাণসহ বহু প্রকল্পে এ খাতের অর্থ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। সামাজিক সুরক্ষার সাথে যার দূরতম সম্পর্ক নেই।
বাস্তবে দরিদ্র মানুষের ৫৩ দশমিক ৯ শতাংশ এ সুরক্ষা নেটওয়ার্কের আওতায় আসেনি। এদিকে দুর্নীতি-অনিয়ম, স্বজনপ্রীতির কারণে বরাদ্দের যেটুকু বাকি থাকে; তা-ও প্রকৃত দরিদ্রদের কাছে পৌঁছে না। সামাজিক সুরক্ষার বিশাল বাজেট দৃশ্যমান হলেও দারিদ্র্যবিমোচনে কাজে আসছে না। গত কয়েক বছরে দেশে দারিদ্র্যের হার বেড়ে যাওয়া তার প্রমাণ। বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে কর্মসূচির সংখ্যা দেড় শ’র কাছাকাছি। এই কর্মসূচি সফল করতে হলে প্রথমে এতে সঙ্গতি আনতে হবে। একজন ধনী সরকারি পেনশনজীবীকে এই নেটওয়ার্কে উল্লেখের কোনো যৌক্তিকতা নেই। এখান থেকে সেই ধরনের কর্মসূচি বাদ দিতে হবে। অন্য সমস্যাটি হলো— সুরক্ষা কাঠামোর রাজনৈতিক বিবেচনায় সুবিধাভোগীর তালিকা তৈরি। এসব ক্ষেত্রে দলীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে এ সুযোগ দেয়া হয়। ফলে যাদের সুবিধা দেয়া হয়, তারা প্রকৃত অভাবী কিংবা আদৌ সুবিধা পাওয়ার অধিকার রাখেন কি-না তা দেখা হয় না। এ অবৈধ প্রভাব থেকে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে রক্ষা করতে হলে একটি নির্ভুল ডাটাবেজ তৈরি করতে হবে; যাতে প্রকৃত উপকারভোগীদের চিহ্নিত করা সহজ হয়।
বিগত এক দশকে সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দকৃত বিপুল অর্থ সেই অর্থে সফল হয়নি। আসন্ন বাজেটে একে সংস্কার করে সামনে আনতে হবে। যাতে এটি দারিদ্র্যবিমোচন ও অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে অর্থবহ পরিবর্তনে সহায়ক হয়।



