ভারত দখল করবে আমাদের বাজার!

পোশাকশিল্পে সতর্কতা জরুরি

তবে সবার আগে জাতীয় পর্যায়ে আলাপ-আলোচনা করে সমস্যার গুরুত্ব ও ব্যাপ্তি নিরূপণ এবং করণীয় নির্ধারণ করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া জরুরি।

চলতি সপ্তাহে ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, ইইউর রফতানি করা প্রায় ৯৬ শতাংশ পণ্যে শুল্ক তুলে নেবে ভারত। আর ভারত থেকে ইইউতে রফতানি করা ৯০ শতাংশ পণ্যে শুল্ক থাকবে না। প্রায় দুই দশক ধরে আলোচনা চলছিল। সেটি ত্বরান্বিত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের চাপিয়ে দেয়া অন্যায্য ট্যারিফের কারণে। রফতানিকারক ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ইইউ ও ভারতের মধ্যকার এফটিএ কার্যকর হলে বাংলাদেশের প্রধান রফতানিপণ্য তৈরী পোশাকশিল্প চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।

চুক্তিটি বিশাল। এতে উভয় পক্ষই লাভবান হতে পারে; কিন্তু এর মধ্য দিয়ে ভারতের বাংলাদেশবিরোধী মনোভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কথিত বন্ধুরাষ্ট্রের সরকারি-বেসরকারি সব মহল থেকে বাংলাদেশের পোশাকশিল্প ধ্বংস হয়ে যাবে, ভারত দখল করে নেবে, এমন কথা বেশ হৃষ্টচিত্তে তুলে ধরা হচ্ছে। চুক্তির ভালোমন্দ বিশ্লেষণের চেয়েও তাদের কাছে যেন মুখ্য হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের ক্ষতির সম্ভাবনা। ভারতের মিডিয়া বলছে, এই চুক্তির ফলে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের পোশাকের ব্যবসার বড় অংশ ভারতের দখলে চলে আসবে। খুশি চেপে রাখতে না পেরে তারা সেটি ঢাকঢোল পিটিয়ে প্রচার করছে। তা তারা করুন। বাংলাদেশকে নিজেদের অবস্থান খতিয়ে দেখতে হবে।

তবে উল্লেখ করা জরুরি, ভারতে এরই মধ্যে চুক্তির নেতিবাচক দিক নিয়ে কথা উঠেছে। ইউরোপীয় খাবার, মদ, উচ্চ মানের গাড়ির মতো যেসব পণ্য বিনা শুল্কে ভারতে ঢুকবে সেগুলো সংশ্লিষ্ট ভারতীয় শিল্পের জন্য কতটা ক্ষতিকর হতে পারে, সে প্রশ্ন উঠছে।

ভারত ইইউতে পোশাক রফতানি করে সাত বিলিয়ন ডলারের। দেশটি আশা করছে, চুক্তি কার্যকর হলে তাদের পোশাক রফতানি ৩০ থেকে ৪০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছতে পারে। বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) হিসেবে বিনা শুল্কে ইইউতে পোশাক রফতানির সুযোগ পায়। এই সুবিধার কারণেই চীনের পর দ্বিতীয় বৃহত্তম রফতানিকারক হতে পেরেছে বাংলাদেশ। এলডিসি থেকে উত্তরণের পর জিএসপি প্লাস সুবিধা পাওয়া যাবে; কিন্তু পোশাক রফতানিতে শুল্ক বসবে। এসব আরো পরে ঘটবে। এই মুহূর্তের সমস্যা হলো– ২০২৭ সালে চুক্তি কার্যকর হলে ভারতের পণ্যে বিদ্যমান ১২ শতাংশ শুল্কও উঠে যাবে। তাতে বাংলাদেশের পণ্য বড় প্রতিযোগিতার মুখে পড়বে। বিক্রি কমে যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে করণীয় ঠিক করে অবিলম্বে তা বাস্তবায়ন করতে হবে।

একটি বিকল্প হতে পারে, বাংলাদেশেরও ইইউর সাথে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করা। ইইউকে একই রকম সুবিধা দিয়ে বাংলাদেশের পোশাকে শুল্কছাড় অব্যাহত রাখার ব্যবস্থা করা। কারণ বাংলাদেশের পোশাকের বৃহত্তম বাজার হারানো যাবে না। তবে এটি সময়সাপেক্ষ হতে পারে। এর আগে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে বিদ্যমান সমস্যাগুলো কাটিয়ে ওঠার দরকার আছে। আমাদের পণ্যের মান আরো উন্নয়নের সুযোগ আছে। বিশেষ করে ভারতের চেয়ে উচ্চ মানের নিশ্চয়তা দিতে হবে। তাহলে ক্রেতারা ভারতের পণ্য ফিরেও দেখবে না। ইউরোপের ক্রেতাদের কাছে দামের চেয়ে মানের কদর বেশি। আমাদের সে দিকে মনোযোগ দিতে হবে।

তবে সবার আগে জাতীয় পর্যায়ে আলাপ-আলোচনা করে সমস্যার গুরুত্ব ও ব্যাপ্তি নিরূপণ এবং করণীয় নির্ধারণ করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া জরুরি।