দেড় দশকের দুঃশাসন আর পৈশাচিকতার একটি উদাহরণ ‘গুম’। মৌলিক অধিকার হরণ করে রাষ্ট্রযন্ত্রের সহায়তায় মানুষকে উধাও করে দেয়ার এই সংস্কৃতি চালু করেছিল শেখ হাসিনা রেজিম। এসবের ক্ষত এখনো বয়ে বেড়াচ্ছে শত শত পরিবার। ৫ আগস্ট বিপ্লবের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই অন্ধকার অধ্যায় প্রকাশ্যে আনতে গঠন করেছিল গুম তদন্ত কমিশন। এই কমিশনকে ঘিরে জনমনে ন্যায়বিচারের আশা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু নির্বাচনের পর নতুন সরকার এসে সেই কমিশন বিলুপ্ত করে দিয়েছে। এখন কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ তথ্যপ্রমাণগুলোও আছে ঝুঁকিতে। গতকাল সহযোগী একটি সংবাদপত্র এ খবর দিয়েছে।
বিলুপ্ত গুম কমিশনের সংবেদনশীল নথিপত্র, ডিজিটাল আলামত এবং প্রভাবশালী সাবেক কর্মকর্তাদের জবানবন্দীসহ বেশ কিছু দলিলপত্র ভরে রাখা হয়েছে ২৪টি কার্টনে। কার্টনগুলো অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে আছে মানবাধিকার কমিশনের একটি কামরায়। ওই কামরার দরজায় লাগিয়ে রাখা হয়েছে হালকা একটি তালা। এসব নথিপত্রে গুমের নেপথ্য কারিগর, নির্দেশদাতা এবং প্রত্যক্ষভাবে জড়িত সামরিক-বেসামরিক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের পৈশাচিকতার অকাট্য প্রমাণ আছে। এগুলো স্তূপ করে ফেলে রাখা ন্যায়বিচারের পথে বড় ধরনের ঝুঁকি। প্রমাণগুলো নষ্ট হলে, সেটি হবে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর সাথে চরম প্রতারণা। সেই সাথে ইতিহাসের অপূরণীয় ক্ষতি।
গুম সাধারণ অপরাধ নয়, মানবতাবিরোধী অপরাধ। এই পৈশাচিকতার শিকারদের অভিজ্ঞতা শুনলে শিউরে উঠতে হয়। তারা বছরের পর বছর ছিলেন ‘জীবন্ত কবরে’। গুম তদন্ত কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্যই এসব অপরাধ করা হয়েছিল। সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে এর প্রত্যক্ষ নির্দেশনা ছিল। এক হাজার ৯১৩টি অভিযোগের মধ্যে এক হাজার ৫৬৯টি গুমের ঘটনার সত্যতা পাওয়া গেছে। শত শত মানুষকে হত্যা করে নদীতে ভাসিয়ে দেয়ার তথ্যও সামনে এসেছে। এমন ভয়াবহ অপরাধের তথ্যপ্রমাণ সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তায় থাকার কথা হলেও সেগুলো নিয়ে করা হচ্ছে চরম অবহেলা।
জাতীয় সংসদে গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশ ও মানবাধিকার অধ্যাদেশ বাতিল হওয়ায় বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এগুলো সাধারণ মানুষের মনে সন্দেহের বীজ বুনে দিচ্ছে। যদিও আইন মন্ত্রণালয় বলছে, আইনগুলো আরো যুগোপযোগী করে করা হবে। কিন্তু কবে করা হবে, কিভাবে করা হবে পরিষ্কার করে বলা হচ্ছে না। যদি করাও হয়, তখন এই নথিগুলোর দরকার হবে। তাহলে নথিগুলো অনিরাপদভাবে ফেলে রাখা হয়েছে কেন?
আমরা মনে করি, এসব নথিপত্র অবিলম্বে একটি সুরক্ষিত ‘ডাটা ব্যাংক’ বা বিশেষ জিম্মায় নেয়া প্রয়োজন, যেখানে কোনো রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাব পৌঁছতে পারবে না। একই সাথে, মানবাধিকার কমিশন পুনর্গঠন এবং গুমসংক্রান্ত আইনকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী দ্রুত চূড়ান্ত করে সংসদে পাস করতে হবে। গুমের শিকার ব্যক্তিদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। অপরাধের সাথে জড়িতরা দেশী হোক, বিদেশী হোক, কিংবা যত প্রভাবশালীই হোক না কেন, তাদের বিচারের আওতায় আনা এবং ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
নথিপত্র হারিয়ে যাওয়ার ‘দুর্ঘটনা’ যেন না ঘটে সরকারকে সর্বোচ্চ সতর্ক হতে হবে। মনে রাখতে হবে, গুমের অপরাধ চিরতরে বিলুপ্ত করতে এ নথিপত্র সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলামত। এই আলামত রক্ষায় অচিরেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এ ব্যাপারে গাফিলতি অবহেলা করার সরকারের কোনো সুযোগ নেই।



