ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন সামনে রেখে দেশের রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন কেন্দ্র করে সরকার ও বিরোধী শিবিরের মধ্যে রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হয়েছে। ডেপুটি স্পিকার পদে বিরোধী দলকে সমর্থনের প্রস্তাব দিয়েছে সরকার। কিন্তু বিরোধী দল বলছে, জুলাই সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের রূপরেখা ছাড়া তারা এই পদ নিতে আগ্রহী নয়।
ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন একটি সাংবিধানিক ও সংসদীয় প্রক্রিয়া। সংসদীয় গণতন্ত্রে বিরোধী দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হিসেবেও এটি বিবেচিত হয়। সরকার যদি সত্যিই বিরোধী দলকে এই পদে দেখতে চায়, সেটি ইতিবাচক বার্তা। কিন্তু একই সাথে এটিও সত্য যে, জুলাই জাতীয় সনদ কেবল একটি রাজনৈতিক প্রস্তাব নয়; এটি গণভোটে অনুমোদিত রাজনৈতিক অঙ্গীকার। এই সনদের পক্ষে রায় দিয়েছে জনগণ। ফলে বিষয়টি কেবল ক্ষমতার ভাগাভাগির প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়।
জুলাই সনদের মূল উদ্দেশ্য ছিল রাজনৈতিক ব্যবস্থায় কাঠামোগত সংস্কার আনা। দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদব্যবস্থা, উচ্চকক্ষে পিআর পদ্ধতিতে প্রতিনিধিত্ব, সাংবিধানিক কমিশনগুলোর কাঠামো নির্ধারণ এবং নির্বাচনী ব্যবস্থার সংস্কার। এসব বিষয়কে কেন্দ্র করেই রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তি তৈরি হয়েছিল। তাই এই সনদকে ‘প্যাকেজ’ আকারে বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি নিশ্চিত করতে চায় বিরোধী শিবির। সেটি না হলে কেবল একটি পদ গ্রহণ করলে গণভোটের মূল লক্ষ্য আড়ালে পড়ে যেতে পারে বলে মনে করেন তারা।
সংসদের প্রথম অধিবেশন দেশের গণতান্ত্রিক যাত্রার গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। এই সময় যদি রাজনৈতিক দলগুলো পারস্পরিক সন্দেহ ও শর্তের বেড়াজালে আটকে যায়, তাহলে সংসদের কার্যকর ভূমিকা শুরু হওয়ার আগেই সঙ্কট তৈরি হতে পারে। গণতন্ত্রে দ্বিমত থাকবে, এটিই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই দ্বিমতকে অচলাবস্থায় রূপ দেয়া কোনো পক্ষের জন্যই লাভজনক নয়।
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে হাইকোর্টের রুলে আদালত জানতে চেয়েছেন— গণভোট অধ্যাদেশ ও জুলাই সনদের বাস্তবায়ন আদেশ কতটা সাংবিধানিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এই পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত বিষয়টিকে আরো দায়িত্বশীলভাবে মোকাবেলা করা। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— জুলাই সনদের চেতনাকে অক্ষুণ্ন রাখা। গণভোটের মাধ্যমে যে রাজনৈতিক বার্তা এসেছে, তাকে অবজ্ঞা করার সুযোগ নেই।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে অতীতে বহুবার দেখা গেছে— সংলাপের অভাবে সঙ্কট দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেয়া জরুরি। জুলাই সনদকে কেন্দ্র করে যে রাজনৈতিক ঐকমত্য একসময় তৈরি হয়েছিল, সেটিকে ভেঙে দেয়ার পরিবর্তে শক্তিশালী করা এখন সময়ের দাবি।
অতএব, ডেপুটি স্পিকার পদকে কেন্দ্র করে যে টানাপড়েন সৃষ্টি হয়েছে, তা দীর্ঘায়িত করা উচিত নয়। এই পদকে প্রতীকী সমঝোতার সূচনা হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। আবার একই সাথে জুলাই সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের পথও খুলে দেয়া সম্ভব। রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও পারস্পরিক আস্থাই পারে এই জট খুলতে।
গণভোটের রায়, সংসদের মর্যাদা এবং গণতান্ত্রিক সংস্কারের অঙ্গীকার— এই তিনের মধ্যে সমন্বয় ঘটাতে পারলেই ১৩তম জাতীয় সংসদের যাত্রা অর্থবহ হয়ে উঠবে। আর সেটিই এখন দেশের রাজনীতির সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।


