বৈদেশিক সম্পর্কে শত্রু-মিত্র স্থায়ী হয় না। এটি নির্ণিত হয় জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে। আজ যে দেশ মিত্র আগামীকাল যে শত্রু হবে না; এর কোনো নিশ্চয়তা নেই। একইভাবে শত্রু দেশও দু’দিন পর মিত্র হতে পারে। বিষয়টি প্রতিবেশী ভারতের বেলায় বাংলাদেশের পতিত হাসিনা সরকার রাজনৈতিক স্বার্থে অগ্রাহ্য করেছে।
বৈদেশিক নিরাপত্তা হুমকিতে প্রতিবেশী দেশ সবসময় থাকে সর্বাগ্রে। যেমনটি বলেছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষক লে. জে. এ. আই. আকরাম (অব:)। তিনি মনে করেন, ‘সম্ভাব্য শত্রু হচ্ছে প্রতিবেশী, সব সময় প্রতিবেশী এবং অবশ্যই প্রতিবেশী।’ স্মরণযোগ্য যে, বৈদেশিক হুমকি বলতে বৈরী দেশের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সামরিক-বেসামরিক কর্মকাণ্ড বোঝানো হয়। প্রত্যক্ষ সামরিক-বেসামরিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে যুদ্ধ ঘোষণা, আগ্রাসন ও সীমান্ত এলাকায় হামলা বুঝানো হয়।
সম্প্রতি গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক অবস্থার সুযোগে সীমান্তে তিনটি সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করেছে ভারত। ভারত ও বাংলাদেশের আসাম সীমান্তের ধুবড়িসংলগ্ন বামুনি, বিহারের কিশনগঞ্জ ও পশ্চিমবঙ্গের চোপড়া এলাকায় এই ঘাঁটিগুলো গড়ে তোলা হয়েছে। বাংলাদেশ সীমান্তের খুব কাছে ভারতের এমন কর্মকাণ্ড ঢাকার নিরাপত্তায় হুমকিস্বরূপ।
গত বছরের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে নতুন মাত্রা পেয়েছে। শেখ হাসিনা সরকার অতীতে যেখানে ভারতের মোদি সরকারের পরম বন্ধু ছিল, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার সেখানে চরম শত্রুতে পরিণত হয়েছে। এর কারণ আর কিছু নয়, ভারতের কাছে ঢাকা প্রাপ্য অধিকার চাওয়ায় বাংলাদেশের প্রতি দিল্লি নাখোশ হয়েছে। ফলে হাসিনা-উত্তর বাংলাদেশবিরোধী প্রোপাগান্ডা রাষ্ট্রীয় মদদে চালাচ্ছে ভারত। বাংলাদেশে কথিত হিন্দু নির্যাতনের ধুয়া তুলে ভারতের বিভিন্ন গোষ্ঠী সে দেশে অবস্থিত বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশন অফিসে হামলা চালায়। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশীদের চিকিৎসা ভিসা দিতেও কড়াকড়ি করেছে ভারত। দুই দেশের বাণিজ্যেও প্রভাব পড়েছে। সব শেষ সীমান্তে এমন সেনাঘাঁটি বাংলাদেশের প্রতি ভারতের বৈরী মনোভাবের চরম বহিঃপ্রকাশ। এমন আচরণ ঢাকার নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিস্বরূপ।
ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদন বলছে, সম্প্রতি বাংলাদেশে পাকিস্তানের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তার সফর ও ড. ইউনূসের চীন সফর ঘিরে কিছু মন্তব্যে ভারত ক্ষুব্ধ। এর বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে সীমান্তে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের ভেতর দিয়ে।
প্রতিবেশীদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন ও তা আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী পরিচালনায় ভারতের অতীত আচরণ অগ্রহণযোগ্য। দিল্লি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সাথে দাদাগিরি করতে বেশি পছন্দ করে। ফলে ভারতের সাথে সীমানা রয়েছে এমন কোনো দেশের সাথে দিল্লির সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ নয়।
বাংলাদেশ পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে অতীতে ভারতের পছন্দ-অপছন্দ আমলে নিত। ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার সে জায়গা থেকে বেরিয়ে এসে ভারসাম্যমূলক বৈদেশিক নীতি গ্রহণ করেছে। এ ক্ষেত্রে দিল্লি রুষ্ট হওয়ায় এটিকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের শামিল বলে মনে করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
আমরা মনে করি, যেকোনো প্রতিবেশীর ক্ষেত্রে ভারতের এমন আগ্রাসী মনোভাব বদলাতে হবে। সাথে সাথে প্রতিবেশীর প্রাপ্য মর্যাদা দিল্লিকে নিশ্চিত করতে হবে। তবেই প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সাথে ভারতের গভীর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠবে। এটি হলে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আসা সম্ভব।



