বাংলাদেশের অর্থনীতি ভেঙে পড়ার পূর্বাভাস ছিল। এমনকি বড় এক ধসের মধ্য দিয়ে হাসিনা রেজিম বিদায় নিতে বাধ্য হবে- এমন ধারণা করা হচ্ছিল। অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের আগে গণ-অভ্যুত্থানে হাসিনা পালিয়ে গেলে শঙ্কা বাড়ছিল অনিয়ম দুর্নীতি লুটপাটে ফোকলা অর্থনীতি তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে পারে। অন্তর্বর্তী সরকারের পরিচালনায় নাজুক অবস্থায় থাকা অর্থনীতির পতন রোধ হয়েছে। খাদের কিনারা থেকে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করলেও দীর্ঘ অপশাসনে সৃষ্ট ক্ষত কাটিয়ে ওঠা সহজ না হওয়ারও ইঙ্গিত মিলছে। তবে অর্থনৈতিক সঙ্কট উত্তরণে রাজনৈতিক ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও স্থিতিশীলতা প্রয়োজন।
রাজধানীতে আয়োজিত একটি অর্থনৈতিক সম্মেলনে রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও পেশাজীবীরা ভবিষ্যতের অর্থনীতি নিয়ে আলোচনা করেছেন। তাতে বর্তমান অর্থনীতির নেতিবাচক দিকগুলোর পাশাপাশি কিভাবে নিরাময়ের মধ্যে ঘুরে দাঁড়ানোর পথ খুঁজছে তাও উঠে এসেছে। লালফিতার দৌরাত্ম্য ঘুষবাণিজ্যের সুযোগ সৃষ্টি করে; অন্য দিকে রয়েছে চাঁদাবাজি, এ দুই কারণে অর্থনীতিতে ন্যায্যতা নেই। এতে এক দিকে প্রান্তিক মানুষ বঞ্চিত হন, পাশাপাশি উদ্যোক্তরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও ঘুষ ও চাঁদবাজি থেকে রেহাই পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপন ও ব্যবসায়ী উদ্যোগ এক প্রকারের স্থবির হয়ে আছে।
গত দেড় দশকে রাষ্ট্রীয় সম্পদ স্রেফ লুটে নিয়েছে একটি শ্রেণী। তাদের কাছে বিপুল সম্পদ জমা রয়েছে। এর বড় একটা অংশ তারা বিদেশে পাচার করেছে। এদের মালিকানায় থাকা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিয়ে তারা সটকে পড়েছে। এই শ্রেণী পালিয়ে থেকে অর্থনীতি ও ব্যবসাবাণিজ্যে একধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। এখন প্রয়োজন তাদের বিচারের আওতায় আনা। অবৈধভাবে অর্জিত বিপুল সম্পদ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফেরত আনা। তাদের মালিকানাধীন শিল্পপ্রতিষ্ঠান অচল না রেখে যেকোনোভাবে সচলের ব্যবস্থা করতে হবে। অর্থনীতির আরেকটি সঙ্কটের জায়গা হচ্ছে ব্যাংক লুটে নেয়া। হাসিনার সময় তথ্য গোপন করে রাখা হয়েছিল। এখন দেখা যাচ্ছে, খেলাপি ঋণ সাড়ে ছয় লাখ কোটি টাকা। এটি মোট ঋণের ৩৫ শতাংশ। হাসিনা ব্যাংকের কোষাগার তার নিজের লোকদের জন্য মুক্ত করে দিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছেন, অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কারের মাধ্যমে তা দূর করতে সচেষ্ট হয়েছে। ব্যাংক খাতে নিয়মকানুন মানার রীতি শুরু হয়েছে। ধীরে ধীরে এ খাতে স্বস্তি ফিরে আসছে। শিল্প খাত ধুঁকছে জ্বালানি সঙ্কটে। সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা না থাকায় এ সমস্যা তৈরি হয়েছে। এ জন্য শিল্প উৎপাদন ৩০ শতাংশের বেশি কমে গেছে। এর সমাধানে জ্বালানির সহজ প্রবাহে অন্তর্বর্তী সরকার কাজ করছে।
বাংলাদেশ দীর্ঘ দুঃশাসনের পর এক অস্থির অন্তর্বর্তী সময় পার করছে। এ সময়ে অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলা থেকে বিপর্যয় হতে পারত। আশার কথা হলো তা হয়নি। অর্থনীতির ক্ষত যেহেতু গভীর তা থেকে উত্তরণও সময়সাপেক্ষ হবে।
বাংলাদেশ সফলভাবে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জন করতে পারবে কি না নির্ভর করছে আসন্ন নির্বাচিত সরকারের ওপর। একটি সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করে ক্ষমতা হস্তান্তরের মাধ্যমে দেশ সম্ভাবনার পথে এগিয়ে যেতে পারে।



