প্রাথমিক শিক্ষার নিম্নমান নিয়ে সমালোচনা আছে। এ জন্য বিগত শেখ হাসিনা সরকার বড় আকারের প্রকল্পও হাতে নিয়েছিল; কিন্তু কাজের কাজ কিছু হয়নি। শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতি দূর হয়নি।
সরকারের প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন ‘বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ইউনিট’ এক প্রতিবেদনে প্রাথমিক শিক্ষার একটি চিত্র তুলে ধরেছে। এতে বলা হয়েছে, বাংলা-ইংরেজি দেখে পড়া (রিডিং) কিংবা সহজ যোগ-বিয়োগ করতে পারে না দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর বেশির ভাগ শিক্ষার্থী।
এই ইউনিট সদস্যরা সারা দেশে চার হাজার ৬১০টি স্কুল পরিদর্শন করেন। এতে শিক্ষার্থীদের শিখন দক্ষতার ওপর ভিত্তি করে স্কুলগুলোকে একটি নম্বর দেয়া হয়। এর মধ্যে যেসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা শূন্য থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত শিখন দক্ষতা অর্জন করে, তাদের ‘সি’ গ্রেড, ৬১ থেকে ৭৯ পর্যন্ত শিখন দক্ষতা অর্জন করলে ‘বি’ গ্রেড আর ৮০ থেকে ১০০ পর্যন্ত শিখন দক্ষতা অর্জন করলে ‘এ’ গ্রেড দেয়া হয়। এতে ‘এ’ গ্রেড পেয়েছে মাত্র ১৩৩টি প্রতিষ্ঠান। এক হাজার ৩৪৩টি প্রতিষ্ঠান ‘বি’ গ্রেড এবং তিন হাজার ১৩৪টি প্রতিষ্ঠান পেয়েছে ‘সি’ গ্রেড।
দক্ষ শিক্ষক হিসেবে গড়ে তোলার জন্য শিক্ষকদের যে ধরনের প্রশিক্ষণ প্রয়োজন ছিল তা দেয়া হয়নি। আবার যারা প্রশিক্ষণ পেয়েছেন তাদের প্রশিক্ষণ কতটুকু ফলপ্রসূ হলো সেটিও পর্যালোচনা করা হয়নি। এমতাবস্থায় এসব শিক্ষকের মাধ্যমে যে শিক্ষা দেয়া হচ্ছে, তাতে শিক্ষার্থীদের কাক্সিক্ষত শিখন দক্ষতা অর্জিত হচ্ছে না।
এমন অনেক প্রত্যন্তু ও দুর্গম অঞ্চল রয়েছে যেসব জায়গায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা শিক্ষক সঙ্কটে ভোগে। শিক্ষার্থীদের ভালোভাবে পড়াশোনা করার জন্য প্রয়োজনীয়সংখ্যক যোগ্য শিক্ষক থাকে না। এসব অঞ্চলে শিক্ষার্থীরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনেকটা অবহেলায় সময় কাটায়।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের শিখন দক্ষতা উন্নত করার জন্য সর্বপ্রথম সরকারের সদিচ্ছা প্রয়োজন। সরকারকে স্পষ্ট করতে হবে, তারা শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে ধনী-গরিব ও শহর-গ্রামের মধ্যে কোনোরকম বৈষম্য করতে চান না।
অতীতে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নানা অনিয়মের মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হলেও এখন সেই অপসংস্কৃতি অনেকটাই কমে আসছে। ফলে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে এখন অনেক মেধাবী শিক্ষক যোগ দিচ্ছেন। এসব মেধাবী শিক্ষককে শিক্ষকতা পেশায় ধরে রাখতে হলে তাদের জন্য আলাদা বেতনকাঠামো ঠিক করতে হবে। তাদের মর্যাদার স্বীকৃতি দিতে হবে।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ঝরে পড়া বন্ধে সরকার মিড-ডে মিলের মতো যে কর্মসূচি চালু রেখেছে- তা প্রশংসনীয়। কিন্তু শিক্ষকদের বেতনভাতা বৃদ্ধি ও প্রশিক্ষণ ব্যতীত শিক্ষার্থীদের শিখন দক্ষতা অধরাই থেকে যাবে।
প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের শিখন দক্ষতা উন্নত না হওয়ার অন্যতম কারণ- শিক্ষকদের অবহেলা। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা যে বেতন পান তাতে তাদের সংসার চালনোই কষ্টকর। ফলে শিক্ষকতার পাশাপাশি তাদের উপার্জনের জন্য ভিন্ন কাজ করতে হয়। আর এতে করে শিক্ষকরা শিক্ষকতা পেশায় পূর্ণ মনযোগী হতে পারেন না। শিক্ষকদের জন্য উন্নতমানের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। সেই সাথে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ শিক্ষার্থীদের কাজে আসছে কি না, তাও তদারকি করতে হবে।
অনুন্নত, দুর্গম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য বিশেষ ভাতা দিতে হবে।



