শরিফ ওসমান হাদি অসাধারণ এক বিপ্লবী; যিনি পুরো দক্ষিণ এশিয়ায় নাড়া দিয়েছেন। এই অঞ্চলের বঞ্চনা ও পীড়নের শিকার এবং আধিপত্যবাদে পিষ্ট জনগোষ্ঠী হাদিকে নিজেদের প্রেরণা হিসেবে দেখছে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়া ভারতীয় শিখ সম্প্রদায় হাদি হত্যার বিচার দাবিতে বিক্ষোভ করেছে। পাকিস্তান, নেপাল ও শ্রীলঙ্কায়ও এই হত্যায় বিপুলসংখ্যক মানুষ ব্যথিত হয়েছেন। বাংলাদেশে চলছে টানা শোক। তবু দুর্ভাগ্য হলো- খুনি ও তাদের সহযোগীদের বিচারের আওতায় আনতে গাফিলতি ও শিথিলতা প্রদর্শিত হয়েছে। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ভেতর থেকে একটি অংশের মধ্যে হাদির খুনিদের আটক ও বিচারের মুখোমুখি করার ক্ষেত্রে জড়তা দৃশ্যমান হয়েছে। বিশেষত গোয়েন্দা ব্যর্থতা স্পষ্ট। এ জন্য বিচার দাবিতে জনতাকে রাস্তায় নামতে হয়েছে।
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দুর্বলতা হাদি হত্যা ঘিরে সহজেই অনুমেয়। একজন নিখাদ দেশপ্রেমিক ও সম্ভাবনাময়ী তরুণ নেতাকে ষড়যন্ত্রকারীরা প্রকাশ্যে রাস্তায় খুন করলেও তাদের আটকের বিষয়টি প্রথমে সর্বোচ্চ গুরুত্ব পায়নি। আমাদের গোয়েন্দা সামর্থ্যরে সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যখন খুনিচক্র পালিয়ে যায়। ভারতে নিরাপদে পৌঁছাতে খুনিচক্রের দেশের ভেতর থেকে একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্কের সহায়তা পাওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট। এরপর কয়েক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও হাদির খুনিদের আটকে অগ্রগতি নেই। যে কারণে তার সহযোদ্ধারা রাজধানীর কেন্দ্র শাহবাগে রাস্তায় নেমে আসেন। টানা বিক্ষোভ করেন। দেশেব্যাপী আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে সরকার নড়েচড়ে বসে। সরকারের পক্ষ থেকে এক উপদেষ্টা শাহবাগে এসে হাদির সহযোদ্ধাদের বিচারের আশ্বাস দিয়েছেন। মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলন করে খুনিদের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। খুনিরা ভারতে পালিয়ে গেছে বলেও জানানো হয়েছে। বেসামরিক প্রশাসনের পক্ষ থেকে খুনি ও তাদের সহযোগীদের বিচারের আওতায় আনতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালানো হচ্ছে বলে নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছে।
চব্বিশের ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশের গুরুতর বিষয়ে প্রতিবেশী ভারতের অসহযোগিতা লক্ষণীয় মাত্রায় বেড়েছে। এ দেশের অপরাধীরা সেখানে গিয়ে সহজে আশ্রয়-প্রশ্রয় পাচ্ছে। হাদির খুনিরা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার নিশ্চিত তথ্য দিয়েছে পুলিশ। ভারতে প্রবেশ করে কার আশ্রয়ে রয়েছে তা-ও প্রকাশ করা হয়েছে। হাসিনার ফ্যাসিবাদে জড়িত প্রধান অপরাধীদের প্রায় সবাই ভারতে আশ্রয় পেয়েছে। আদালতে দণ্ডিত হওয়ার পরও দেশটি এসব অপরাধীকে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করছে না।
সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ জানিয়েছে, হাদি খুনের মামলায় ছয়জন দায় স্বীকার করেছে। চারজন সাক্ষী হয়েছে। তারা আগামী সাত থেকে ১০ দিনের মধ্যে অভিযোগপত্র দাখিল করবেন। এ দিকে বিভিন্ন মারফতে সরকার ভারতের কাছে হাদি হত্যায় জড়িতদের ফেরত চেয়েছে। এ অবস্থায় বিচার নির্ভর করছে অপরাধীদের ভারত ফিরিয়ে দেবে কি না, তার ওপর।
বাংলাদেশের খুনি-দুর্বৃত্তদের ভারত প্রকাশ্যে আশ্রয় দিলে আমাদের দেশে শান্তি-স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করা খুব কঠিন। প্রতিবেশীদের সাথে স্বাভাবিক সম্পর্ক প্রত্যাশা করতে হলে অন্তত খুনিদের ফিরিয়ে দিতে হবে ভারতকে। বাংলাদেশ সরকারের এ ব্যাপারে দিল্লিকে কড়া বার্তা দেয়ার আর কোনো বিকল্প নেই।



