হাওরাঞ্চলে এবার বিপুল সংখ্যক কৃষক বোরো ফসল ঘরে তুলতে পারেননি। উজানের ঢল ও অতিবৃষ্টিতে ক্ষেতের ধান ডুবে তারা আজ সর্বস্বান্ত। প্রশ্ন হচ্ছে- এর জন্য কী শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ উজানের পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টি দায়ী? নাকি মানবসৃষ্ট অন্য কোনো কারণও রয়েছে?
গণমাধ্যমের খবর, এক ক্ষেতে দুই রকমের ধান। কোনোটি পাকা, কোনোটি কাঁচা। কোনো গাছে শীষ বের হয়নি। ফলে অন্য বছরের তুলনায় ধান কাটতে বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয় কৃষককে। এর মধ্যে অতিবৃষ্টি ও উজানের পানি ঢুকে পড়ে হাওরে। ডুবে যায় ধানক্ষেত। এই দুইয়ে মিলে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েন কৃষক।
বিএডিসির সরবরাহ করা ব্রি-৮৮ এর বীজের সাথে ব্রি-৯২ জাতের ধানের মিশ্রণ ঘটেছে। তবে অতিবৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে মিশ্রণ না ঘটা ধানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
চুয়াডাঙ্গায় বিএডিসির বীজ প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রে এ মিশ্রণ ঘটে। সংশ্লিষ্ট সংস্থার সূত্র মতে, অন্তত ১০০ টন বা এক লাখ কেজি বীজে এই মিশ্রণের ঘটনা ঘটেছে। মিশ্রিত বীজের কারণে ধান পাকতে দেরি হওয়ায় হাওরের কৃষকদের এ বিপর্যয়ে পড়তে হয়েছে।
ব্রি-৮৮ বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) উদ্ভাবিত একটি উচ্চফলনশীল ও স্বল্পমেয়াদি বোরো ধানের জাত। এটি মূলত ব্রি-ধান-২৮ এর আধুনিক বিকল্প হিসেবে পরিচিত। ব্রি-৮৮-কে কৃষি বিভাগ ও বিএডিসির স্বল্পমেয়াদি ও উচ্চফলনশীল বোরো জাত। এটি স্বল্প সময়ে পাকে, ফলনও দেয় বেশি। হাওরের জন্য এই জাতকে উপযোগী বলে মনে করা হয়। কারণ হাওরে কৃষকের সবচেয়ে বড় ভয় আগাম বন্যা। কৃষি বিভাগ থেকে আশ্বাস দেয়া হয়েছিল, পাহাড়ি ঢল নামার আগে ব্রি-৮৮ ধানের ফসল ঘরে তোলা যাবে। এ আশায় কৃষক বেশি দামে বিএডিসির প্যাকেটজাত বীজ কিনেছিলেন। সরকারি বীজ বলে তারা নিশ্চিন্তে ছিলেন। কেউ ভাবতেও পারেননি, সেই বীজ তাদের জন্য কাল হবে। বাস্তবে দেখা গেল, এবার বিএডিসির ভুলও ফসল ডোবার জন্য দায়ী।
কৃষি কর্মকর্তাদের বক্তব্য, ব্রি-৮৮ ধান পাকতে সময় লাগে ১৪০-১৪৫ দিন। আর ব্রি-৯২ পাকতে সময় লাগে ১৫০-১৫৬ দিন। হাওরাঞ্চলে কৃষক যাতে তুলনামূলক আগে ফসল তুলতে পারেন, সেজন্য ব্রি-৮৮ লাগানো হয়। সেখানে এক সপ্তাহ-দশ দিনের ব্যবধানে ফসলডুবির মতো বড় বিপর্যয় অতীতে ঘটেছে। এবারো এক সপ্তাহ সময় পেলে কৃষক নিরাপদে ও অনায়াসে ধান ঘরে তুলতে পারতেন। কিন্তু ক্ষেতে একই সাথে ব্রি-৮৮ ও ব্রি-৯২ জাতের ধান থাকায় কিছু ধান আগে পেকেছে। বাকি ধান পাকার অপেক্ষায় থেকে কৃষক সর্বস্বান্ত হয়েছেন। একই প্যাকেটে দুই জাতের বীজ থাকায় এমন ঘটনা ঘটেছে। কিশোরগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরও বলছে, বীজে বিভিন্ন জাতের মিশ্রণ ছিল। এ কারণে অনেক কৃষক ভয়াবহ ক্ষতিতে পড়েছেন।
শুধু হাওরাঞ্চলে নয়, দেশের অন্য অঞ্চলেও এই মিশ্রিত বীজ বাজারজাত করা হয়। সরকারি প্রণোদনার আওতায় বিতরণ করা ধান বীজ নিয়েও একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে। কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জে কৃষি বিভাগের প্রদর্শনী ক্ষেতেও একই সমস্যা দেখা গেছে।
যদিও হাওরের ফসল হারানো ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের আর্থিক সহায়তা দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। সেই অর্থ দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের কাছে পৌঁছে দিতে তালিকা প্রস্তুতির কাজ চলছে। তবু আমরা বলতে চাই- বিএডিসির এমন ভুল অমার্জনীয়। যারা এ ভুল করেছেন, তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি। শুধু বদলি এমন ভুলের দায়মুক্তি পেতে পারে না।



