ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধ বাংলাদেশের জন্য নানা দিক থেকে এক অশনিসঙ্কেত। কারণ বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ দু’টি বিষয়ে মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল। জ্বালানি তেলের দাম, আমদানি ব্যয়, রেমিট্যান্সপ্রবাহ ইত্যাদি মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির সাথে গভীরভাবে যুক্ত। মধ্যপ্রাচ্য আমাদের জ্বালানির উৎস এবং সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার। দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আহরণের দ্বিতীয় বৃহত্তম খাত প্রবাসী আয়। সেটি সবচেয়ে বেশি আসে মধ্যপ্রাচ্যের পাঁচটি দেশ সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত ও ওমান থেকে। তেল ও গ্যাসের বড় অংশও আসে এসব দেশ থেকে। দেশগুলো এখন নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে।
যুদ্ধ শুরুর এক দিনের মাথায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। গত শুক্রবার পরিশোধিত তেল প্রতি ব্যারেল প্রায় ৭৩ ডলার দরে লেনদেন হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সঙ্ঘাত সীমাবদ্ধ থাকলেও এই দর ৮০ ডলারে, আর সরবরাহ দীর্ঘ সময় ধরে বন্ধ থাকলে ১০০ ডলারে উঠে যেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল হামলার পর গত শনিবার থেকে ইরান হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশের এলএনজি ও তেল আমদানি ব্যাহত হতে পারে। তেমন কিছু ঘটলে বিদ্যুৎ, শিল্প, পরিবহন এবং সাধারণ জীবনযাত্রায় ব্যাপক প্রভাব পড়বে। তেল ও গ্যাসের দাম বাড়বে, বাড়বে পণ্যের মূল্য। আর এর চূড়ান্ত বোঝা পড়বে সাধারণ মানুষের কাঁধে।
বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুদ্ধ যদি দুই সপ্তাহের মধ্যে শেষ হয় তাহলে দেশে তেমন প্রভাব পড়বে না। পেট্রোলিয়াম করপোরেশন-বিপিসির হাতে ৩৫ থেকে ৪০ দিনের জ্বালানি মজুদ থাকে। তা দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেয়া যাবে। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে বিরূপ প্রভাব পড়বে। এক দিকে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়বে, অন্য দিকে পরিবহন ব্যয় বাড়বে কয়েক গুণ। ফলে স্বৈরাচারের লুটপাটে বিপর্যস্ত অর্থনীতি আরো গভীর সঙ্কটে পড়তে পারে।
যুদ্ধের এই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে আমাদের প্রবাসী শ্রমিকরা চরম উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্যে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অবস্থান করছেন। তাদের চাকরি-বাকরিও ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে যুদ্ধ প্রলম্বিত হলে। সেক্ষেত্রে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যেতে পারে। অনেককে দেশে ফিরে আসতে হতে পারে।
সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের জরুরি ভিত্তিতে পর্যালোচনায় বসা দরকার। শুধু অর্থনৈতিক প্রভাব নয়, প্রবাসী বাংলাদেশীদের নিরাপত্তার বিষয়েও সরকারের করণীয় আছে।
যুদ্ধের প্রভাবে দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় অনেক পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার শঙ্কার কথাও বলছেন অর্থনীতিবিদরা। বিষয়টি নতুন সরকারকে দ্রুত এবং গুরুত্বের সাথে পর্যালোচনা করতে হবে। এই মুহূর্তে করণীয় নির্ধারণ করতে হবে।
তবে সব পরিস্থিতিরই নেতি এবং ইতিবাচক প্রভাব থাকে। অনেক সময় যুদ্ধ কারো ভাগ্য খুলেও দেয়।
অতীতে দেখা গেছে, তেলের দাম বাড়লে মধ্যপ্রাচ্যে তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোর আয়, উন্নয়ন প্রকল্পে বিনিয়োগ এবং বিদেশি শ্রমিকের চাহিদাও বাড়ে। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য রেমিট্যান্সপ্রবাহ বাড়ার সুযোগও তৈরি হতে পারে। সব দিকই ভেবে দেখতে হবে এবং এই মুহূর্তের করণীয় ঠিক করতে হবে। জ্বালানির বিকল্প উৎস খোঁজা, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধির মতো বিষয় বিবেচনা করা জরুরি। একই সাথে কৌশলগত তেল মজুদ বাড়ানো যেতে পারে।



