জুলাই জাতীয় সনদ নিয়ে জাতীয় সংসদে প্রাণবন্ত বিতর্ক হয়েছে। পাল্টাপাল্টি বক্তব্য এসেছে সরকারি ও বিরোধী দলের পক্ষ থেকে। প্রায় দুই দশক পর সংসদে সত্যিকার গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যু নিয়ে আলোচনা হতে দেখে জনগণ তুষ্ট, রাজনীতিকরা আত্মপ্রসাদ লাভ করতে পারেন; কিন্তু একটু গভীরে গিয়ে ভাবলে বোঝা যাবে, বিষয়টি মোটেও প্রীতিকর নয়। কারণ এমন একটি বিষয়কে তর্কের বিষয় করা হয়েছে, যেটি যেকোনো বিবেচনায় বিতর্কের ঊর্ধ্বে থাকার কথা। বিষয়টি নজিরবিহীন শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু নির্বাচন এবং গণভোটে জনগণের অনুমোদন পেয়েছে।
যতই যুক্তি তুলে ধরা হোক– এ বাস্তবতা কখনো মুছে যাবে না যে, বর্তমান সংসদ হলো চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ফলে। আর জুলাইয়ের গণ-আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নের অঙ্গীকার হিসেবে এসেছে জুলাই জাতীয় সনদ। শুধু তাই নয়, জুলাই অভ্যুত্থানে ফ্যাসিবাদ উৎখাতের পর অন্তর্বর্তী সরকার, নির্বাচন, গণভোট ও সংসদ গঠন– সব হয়েছে রাষ্ট্রপতির আদেশের মাধ্যমে। স্বাভাবিকভাবে জনমনে প্রশ্ন উঠবে, জুলাই সনদের আওতায় সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন কেন ডাকা যাবে না। কেন এ নিয়ে নতুন করে বিতর্কের অবতারণা করা হবে?
সংবিধানে এমন কোনো পরিষদের অস্তিত্ব না থাকায় প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে অধিবেশন আহ্বানের পরামর্শ দিতে পারেন না বলে সরকারের পক্ষ থেকে যেসব কথা বলা হচ্ছে, বাস্তবতার আলোকে সেটি ধোপে টেকে না। যেমনটি বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান বলেছেন, বর্তমান সংসদ স্বাভাবিক নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আসেনি; বরং রাষ্ট্রপতির জারি করা আদেশের মাধ্যমে এর জন্ম হয়েছে।
জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশে বলা আছে, গণভোটে জনগণ অনুমোদন দিলে জাতীয় সংসদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করা হবে এবং তা করতে হবে সংসদ নির্বাচনের ফল ঘোষণার ৩০ দিনের মধ্যে। আরো বড় বিষয়, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেয়ার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন।
জুলাই আদেশ অনুযায়ী বিরোধী দলের ৭৭ জন সংসদ সদস্য সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছেন। তারা সে দায়িত্ব পালন করতে চান। সে সুযোগ তাদের দেয়া হচ্ছে না।
বিএনপি সরকার যদি উল্টো বয়ানে অনড় থাকে, জুলাইয়ের জন-আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে হাঁটার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে তা কেবল গণ-অবস্থানের সাথে সাংঘর্ষিক উদাহরণ হয়ে থাকবে না; বরং দলটির স্থায়ী চরিত্র বা বৈশিষ্ট্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার ঝুঁকি থেকে যাবে। কারণ নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের পতনের পর ক্ষমতায় এসেও স্বাক্ষরিত তিন জোটের রূপরেখা বাস্তবায়ন করা হয়নি। ১৯৯০ সালে তিন দলীয় জোটের রূপরেখা বাস্তবায়নের অঙ্গীকার থেকে সরে এসেছিল তৎকালীন সরকার। এবারো বিএনপি নেতাদের বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডে একই লক্ষণ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এটি কেবল দুঃখজনক নয়, জাতির জন্য দুর্ভাগ্যজনক।



