নির্বাচনী মাঠেও নিরাপত্তাহীন নারীরা, দৃঢ় পদক্ষেপ জরুরি

নির্বাচন একটি জাতীয় উৎসব। এই উৎসব নারী ও পুরুষ সবার জন্য। কিন্তু নির্বাচনী উৎসবে অংশ নিতে ভোটারের অর্ধেক জনগোষ্ঠী, অর্থাৎ নারীদের যদি ভয় থাকে, তাহলে নির্বাচনী পরিবেশ কতটা আছে, সে প্রশ্ন থেকে যায়। ভোটের প্রচার করতে গিয়ে নারীরা হেনস্তা ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে পড়ছেন।

ঢাকা-১৫ আসনসহ বিভিন্ন এলাকায় নির্বাচনী প্রচারের সময় নারীকর্মীদের ওপর হামলা, নেকাব খুলে নেয়া, মোবাইল ফোন কেড়ে নেয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সাথে বৈঠক করে এসব অভিযোগ জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রতিনিধিদল। অভিযোগগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এগুলো মাঠপর্যায়ে আচরণবিধি কার্যকর না থাকাই স্পষ্ট করছে।

নির্বাচন কমিশনের সাথে বৈঠকে একটি রাজনৈতিক দলের এমন শঙ্কা প্রকাশ প্রমাণ করে, কমিশনের আশ্বাস ও বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে এখনো বড় ফাঁক রয়ে গেছে। ‘আমরা দেখব’, ‘পদক্ষেপ নেওয়া হবে’- এমন আশ্বাস বহুবার শোনা গেছে। কিন্তু মাঠের বাস্তবতায় তার প্রতিফলন না থাকলে এসব আশ্বাস হিসেবেই থেকে যায়।

নারীকর্মীদেরকে পরিকল্পিতভাবে হেনস্তা কেবল আচরণবিধির লঙ্ঘন নয়; এটি নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণকেও নিরুৎসাহিত করে। যেখানে দেশের মোট ভোটারের প্রায় অর্ধেক নারী, সেখানে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করা মানে নির্বাচনকে একপেশে করে তোলা। নারীরা যখন নারীদের কাছে গিয়ে কথা বলেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই আস্থার জায়গা তৈরি হয়। এটি গণতন্ত্রের জন্য ইতিবাচক। সেই জায়গায় আঘাত করা মানে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় আঘাত।

এখানে নির্বাচন কমিশনের দুর্বলতা চোখে পড়ার মতো। মাঠপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও ম্যাজিস্ট্রেটদের মধ্যে আচরণবিধি ও আইনের ব্যাখ্যা নিয়ে অস্পষ্টতা আছে। কোনো এমপিওভুক্ত শিক্ষক যদি প্রার্থী হতে পারেন, তাহলে তারা কেন নির্বাচনী প্রচারে অংশ নিতে পারবেন না? এটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কিন্তু মাঠপর্যায়ে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বাধা দেয়া ও জরিমানা করার অভিযোগ রয়েছে। এতে স্পষ্ট, মাঠপর্যায়ে সমন্বয় ও প্রশিক্ষণের ঘাটতি রয়েছে। আইনি ব্যাখ্যার দুর্বলতায় নাগরিকের সম্মানহানি গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

অভিযোগ তাৎক্ষণিকভাবে নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থাও দেখা যাচ্ছে না। অভিযোগ পাওয়ামাত্র দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেয়া না হলে অপরাধীরা আরো বেপরোয়া হতে পারে। এতে পরিস্থিতি নির্বাচন পর্যন্ত নয়, নির্বাচনের পরও অস্থিতিশীল হতে পারে।

নারীদের নিরাপত্তাকে এখনো আলাদা করে অগ্রাধিকার হিসেবে দেখছে না কমিশন। অথচ এটি এখন নির্বাচনের কেন্দ্রীয় ইস্যু। এই প্রেক্ষাপটে নারীকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিটি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বিশেষ মনিটরিং টিম গঠন করা যেতে পারে। এই টিমে নারী পুলিশ সদস্য রাখতে হবে। আচরণবিধি ভঙ্গ ও নারীদের হেনস্তার ঘটনায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নিতে হবে। মাঠপর্যায়ের প্রশাসন, ম্যাজিস্ট্রেট ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দ্রুত ব্রিফ করে আইনি ব্যাখ্যার অস্পষ্টতা দূর করতে হবে। অভিযোগ করার সুযোগ অবারিত রাখতে হবে। অভিযোগের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই অগ্রগতি মানুষের সামনে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। নির্বাচন কমিশনের মনে রাখা দরকার, নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা কেবল ব্যালট বাক্সে নয়, ভোটের পরিবেশেও নির্ধারণ হয়।

সময় এখনো আছে। কমিশন চাইলে দৃঢ় ভূমিকা নিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে। না হলে এর দায় এড়ানোর সুযোগ থাকবে না।