ঢাকায় উন্নয়ন আর অব্যবস্থাপনার দ্বন্দ্ব প্রতিদিনই প্রকট হয়ে উঠছে। বায়ুদূষণ, জলাবদ্ধতা, অপরিকল্পিত বর্জ্য ও দূষিত পানির কারণে নগরজীবন এক অদৃশ্য চাপে যেন অবরুদ্ধ। এই বাস্তবতায় রাজধানীর স্যানিটেশন, কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পানিদূষণ নিয়ন্ত্রণে ৩৭ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণ অনুমোদন করেছে বিশ্বব্যাংক, যা বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় চার হাজার ৫২৮ কোটি টাকা। অঙ্কটি নিঃসন্দেহে বড়। তবে একই সাথে বেড়েছে প্রত্যাশার মাত্রাও। প্রশ্ন থেকে যায়, এই বিপুল অর্থায়ন কি ঢাকার পরিবেশগত সঙ্কটের স্থায়ী সমাধান আনতে পারবে? নাকি আরেকটি ‘প্রকল্পনির্ভর’ সাময়িক সমাধানেই সীমাবদ্ধ থাকবে?
ঢাকা এক জটিল জলবায়ু-সংবেদনশীল মহানগর। মাত্র ২০ শতাংশ বাসিন্দার পাইপযুক্ত পয়ঃনিষ্কাশন সংযোগ রয়েছে। কার্যকর পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থাপনার আওতায় আছে মাত্র ২ শতাংশ মানুষ। এর বিপরীতে, ৮০ শতাংশের বেশি অপরিশোধিত বর্জ্য সরাসরি খাল ও নদীতে গিয়ে পড়ছে। এক সময়কার সচল জলপথের অর্ধেকের বেশি বিলুপ্ত, অথবা দখল ও দূষণে মৃতপ্রায়। এই বাস্তবতায় নদী উদ্ধার, বর্জ্য শোধন ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ যথেষ্ট সময়োপযোগী।
কিন্তু সমস্যার শেকড় অনেক গভীরে। দ্রুত ও অপরিকল্পিত নগরায়ন, শিল্পায়নের অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার এবং প্রশাসনিক সমন্বয়ের অভাব ঢাকার জলাশয়গুলোকে দূষণের কেন্দ্রে পরিণত করেছে। রফতানিমুখী পোশাক কারখানার প্রায় ৮০ শতাংশ ঢাকায় অবস্থিত; প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত শিল্পবর্জ্য নদীতে পড়ছে। এ সংক্রান্ত আইনের কার্যকর প্রয়োগ নেই। পরিবেশগত ছাড়পত্র দেয়ার ক্ষেত্রেও তদারকি সীমিত। ফলে দূষণ বাড়ছে, জনস্বাস্থ্য ও অর্থনীতি হুমকিতে পড়ছে।
বিশ্বব্যাংকের এই কর্মসূচিতে পাঁচ লাখ ৫০ হাজার মানুষকে নিরাপদ পানি ও পাঁচ লাখ মানুষকে উন্নত স্যানিটেশনের আওতায় আনা হবে। পাশাপাশি এতে ডিজিটাল রিয়েল-টাইম দূষণ পর্যবেক্ষণ, সমন্বিত নদী পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো শক্তিশালী করা হবে। এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। তবে অভিজ্ঞতা বলছে, প্রকল্পের নকশা যতই উন্নত হোক, বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও ধারাবাহিক তদারকি না থাকলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— এটি ঋণ, অনুদান নয়। অর্থাৎ সুদসহ এই অর্থ পরিশোধ করতে হবে। তাই প্রকল্প ব্যয়ের দক্ষতা, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং ফলাফলভিত্তিক মূল্যায়ন জরুরি। কেবল অবকাঠামো বানালেই হবে না; এসবের রক্ষণাবেক্ষণ, স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ এবং বেসরকারি খাতের কার্যকর সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করাও জরুরি।
ঢাকার নদী ও খাল পুনরুদ্ধার করতে হলে দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। শিল্পবর্জ্য শোধনব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করতে হবে। নাগরিকদেরও সচেতন হতে হবে। ড্রেনে ময়লা ফেলা, প্লাস্টিকের অবাধ ব্যবহারের মতো কাজ বন্ধে সামাজিক দায়বদ্ধতা জরুরি।
মনে রাখতে হবে, ঋণের অর্থে নেয়া প্রকল্প যেন দায়সারা না হয়। সরকার, সিটি করপোরেশন, ওয়াসা, শিল্প খাত ও নাগরিক সমাজকে এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। শহর বাঁচাতে হলে নদী বাঁচাতে হবে। নিতে হবে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, থাকতে হবে স্বচ্ছতা, কঠোর জবাবদিহি ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা।
গতকাল সংসদ নির্বাচনে ভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। এখন রাজনৈতিক সরকার দায়িত্ব নেবে। এই পরিবর্তনের সময় নাগরিকদের প্রত্যাশাও জেগে উঠেছে নতুন করে। ঢাকার মতো বড় ও ঝুঁকিপূর্ণ নগরের ক্ষেত্রে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে নতুন সরকারকে। এটি কেবল প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়, তাদের রাজনৈতিক অঙ্গীকারের পরীক্ষা।



