সহিংসতার সাম্প্রদায়িক রঙ চড়ানো, গণমাধ্যমের দায়িত্বশীল হতে হবে

প্রোপাগান্ডার বিপরীতে সত্যের লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। রাষ্ট্র, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজ, সবার সম্মিলিত সচেতনতাই পারে অপপ্রচার রুখে দিতে।

বাংলাদেশ বহু ধর্ম ও বহু সংস্কৃতির দেশ। এখানে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি আছে। আর এ কারণেই আছে সামাজিক স্থিতি। এই স্থিতি নষ্ট করতে সক্রিয় বেশ কিছু মহল। বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন হচ্ছে বলে প্রোপাগান্ডা চালাচ্ছে তারা। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে ঘিরে যেকোনো অপরাধই উদ্বেগের। তবে সেই অপরাধকে কিভাবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে, কোন ভাষায় উপস্থাপন করা হচ্ছে, সেটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে প্রকাশিত একটি তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদন এ ক্ষেত্রে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত পুলিশের যাচাই করা নথির আলোকে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়। এতে জানানো হয়েছে, সংখ্যালঘুসংশ্লিষ্ট মোট ৬৪৫টি ঘটনার মধ্যে মাত্র ৭১টিতে সাম্প্রদায়িকতার উপাদান পাওয়া গেছে। বাকি ৫৭৪টি ঘটনা মূলত চুরি, জমি নিয়ে বিরোধ, ব্যক্তিগত শত্রুতা, রাজনৈতিক সহিংসতা বা অন্যান্য অপরাধমূলক কাজ। এই পরিসংখ্যান শুধু বাস্তব ছবিই তুলে ধরেনি। বরং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিভ্রান্তির বিপরীতে তথ্যের শক্তিকেই প্রতিষ্ঠা করেছে। এই প্রতিবেদন প্রমাণ করেছে, সরকার সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে দায় এড়াচ্ছে না। বরং অপরাধকে অপরাধ হিসেবেই দেখার অবস্থান নিচ্ছে।

এই বাস্তবতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে কয়েক দিন আগে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে জার্মানভিত্তিক গণমাধ্যম ‘ডয়চে ভেলে বাংলা’। তারা শিরোনাম করেছে, ‘ভোটের আগে সংখ্যালঘু হত্যা, সাম্প্রদায়িক বলতে চায় না সরকার।’

প্রতিবেদনের ভেতরের ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বেশ কয়েকটি হত্যাকাণ্ড ও সহিংস ঘটনার পেছনে আছে ছিনতাই, পূর্বশত্রুতা ও ব্যক্তিগত বিরোধ। রাজবাড়ীতে চাঁদাবাজির অভিযোগে অমৃত মন্ডল ওরফে সম্রাট নামের এক যুবককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। তিনি এলাকায় একটি সন্ত্রাসী বাহিনী গড়ে তুলেছিলেন বলে পুলিশের বরাত দিয়ে জানিয়েছে ডয়চে ভেলে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা কোনো কোনো ঘটনায় অভিযুক্তরা গ্রেফতার হয়ে স্বীকারোক্তিও দিয়েছেন। কিন্তু তার পরও শিরোনাম ও উপস্থাপনায় একটি পূর্বনির্ধারিত বয়ান চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।

প্রমাণ ছাড়া কোনো ঘটনাকে ‘সাম্প্রদায়িক’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা হতে পারে না। সেটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক প্রচারণার অংশ হয়ে যায়। এই প্রচারণা কেবল দেশের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নয়। ২০২৪-এর বিপ্লবের পর থেকেই ‘বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের’ অভিযোগ করে আসছে ভারতের কিছু গণমাধ্যম। বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বেকায়দায় ফেলার এমন অপচেষ্টা নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সেই দাবিগুলো নতুন মোড়কে আসছে।

এসব প্রচারণা ঠেকাতে সরকারের আরো কিছু উদ্যোগ নেয়া জরুরি। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে প্রকাশ করা এই প্রতিবেদনের মতো আরো প্রতিবেদন নিয়মিত প্রকাশ করা যেতে পারে। সেই সাথে রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি গণমাধ্যমে ফ্যাক্ট-চেক ব্যবস্থাকে দেয়া যেতে পারে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বাংলাদেশ-বিষয়ক বিভ্রান্তিকর প্রতিবেদনগুলোর বিরুদ্ধে কূটনৈতিক ও তথ্যভিত্তিক প্রতিবাদ জোরদার করা দরকার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ও উসকানিমূলক কনটেন্ট শনাক্ত করতে হবে। বাড়াতে হবে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি। তবে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে, এই নজরদারি যেন সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য ঝামেলা তৈরি না করে।

সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রশ্নাতীত দায়িত্ব। সাম্প্রদায়িকতাও একটি বাস্তব সমস্যা। কিন্তু সব অপরাধ সাম্প্রদায়িক নয়। এই পার্থক্য না বোঝা বা ইচ্ছাকৃতভাবে মুছে ফেলা বিপজ্জনক।

প্রোপাগান্ডার বিপরীতে সত্যের লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। রাষ্ট্র, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজ, সবার সম্মিলিত সচেতনতাই পারে অপপ্রচার রুখে দিতে।