ঈদে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি

অব্যবস্থাপনা মূলত দায়ী

ঈদের আনন্দ তখনই পরিপূর্ণ হবে, যখন সবাই নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবে। শুধু ঈদ নয়, সারা বছর সড়কে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। যাত্রীদেরও সচেতন ও দায়িত্বশীল হতে হবে। ঈদসহ সব সড়কযাত্রা যেন বেদনায় রূপ না নেয়, সেটিই কাম্য।

প্রতি বছর ঈদ আসে আনন্দ, উৎসব এবং প্রিয়জনদের সাথে মিলনের বার্তা নিয়ে। কিন্তু এই আনন্দযাত্রা অনেক সময় রূপ নেয় বিষাদে। ঈদের আগে-পরে সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বেড়ে যায়। বহু মানুষ হতাহত হয়। এবারো ঈদযাত্রায় বেসরকারি হিসাব মতে, গত ২৫ মার্চ পর্যন্ত সড়কে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ২৪২ জন। এর মধ্যে গত বুধবার রাজবাড়ীর গোয়ালন্দের দৌলতদিয়া ঘাটে যাত্রীবাহী বাস পদ্মা নদীতে পড়ে ডুবে যায়। এতে গতকাল বৃহস্পতিবার এ সম্পাদকীয় লেখা পর্যন্ত ২৬ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে রাজবাড়ী জেলা প্রশাসন পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। এ ছাড়া কুমিল্লায় ঈদের দিন গভীর রাতে ট্রেনের ধাক্কায় বাসের ১২ যাত্রী নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায়ও তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে।

সড়ক দুর্ঘটনা অনেক দিন ধরে আমাদের জাতীয় জীবনে অন্যতম একটি সমস্যা। সবার মনে থাকার কথা, ২০১৮ সালে ঢাকার বিমানবন্দর সড়কে বাসচাপা পড়ে দুই কলেজ শিক্ষার্থীর মৃত্যু হলে সারা দেশে ‘নিরাপদ সড়ক আন্দোলন’ দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। তখন সরকার সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে নতুন আইন প্রণয়নসহ বেশ কিছু পদক্ষেপ নেয়। কিন্তু পরে পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের কারণে সে আইন সংশোধন করা হয়। ফলে কাঙ্ক্ষিত সুফল মেলেনি। সড়কের বিশৃঙ্খলার অবসান হয়নি।

ঈদ উপলক্ষে শহর থেকে গ্রামের পথে মানুষের ঢল নামে। তখন সড়ক দুর্ঘটনায় বহু মানুষের প্রাণহানি যেন স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে ঈদে সড়ক দুর্ঘটনা কোনো একক কারণে নয়, বরং অতিরিক্ত চাপ, অব্যবস্থাপনা, আইন অমান্য এবং সচেতনতার অভাব মিলে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ঈদে সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে সরকারের পক্ষ থেকে নানা পদক্ষেপ নেয়া হলেও কাজের কাজ কিছু হয় না।

ঈদযাত্রায় অতিরিক্ত যাত্রী বহন, অনিয়ন্ত্রিত গতিতে গাড়ি চালানো, ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল এবং চালকদের অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা— এ সময় সড়ক দুর্ঘটনা বেশি হওয়ার প্রধান কারণ। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার তৎপরতা ঈদে বাড়ানো হলেও তা যথেষ্ট নয়। বাস্তবতা হলো, সড়ক ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, মহাসড়কে শৃঙ্খলার অভাব এবং ট্রাফিক আইন অমান্য করার প্রবণতা পরিস্থিতি আরো জটিল করে তুলেছে। ফলে এক দিকে প্রাণহানি ঘটছে, অন্য দিকে অসংখ্য পরিবার হারাচ্ছে প্রিয়জন।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। প্রথমত, ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা। দ্বিতীয়ত, চালকদের জন্য নির্ধারিত কর্মঘণ্টা নিশ্চিত করা এবং তাদের পর্যাপ্ত বিশ্রামের ব্যবস্থা রাখা। তৃতীয়ত, যাত্রীদের সচেতন হওয়া, ঝুঁকিপূর্ণ ভ্রমণ এড়িয়ে চলা। এ ক্ষেত্রে ট্রাফিক আইন মেনে চলা জরুরি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, আমাদের মানসিকতায় পরিবর্তন আনা। দ্রুত পৌঁছানোর চেয়ে নিরাপদে পৌঁছানো হওয়া উচিত প্রধান লক্ষ্য।

ঈদের আনন্দ তখনই পরিপূর্ণ হবে, যখন সবাই নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবে। শুধু ঈদ নয়, সারা বছর সড়কে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। যাত্রীদেরও সচেতন ও দায়িত্বশীল হতে হবে। ঈদসহ সব সড়কযাত্রা যেন বেদনায় রূপ না নেয়, সেটিই কাম্য।