জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে কয়েক দিনের ছুটি ও যানবাহন চলাচলে বিধিনিষেধ ছিল। সেইসাথে সীমিত ছিল মোবাইল ব্যাংকিং সেবা। এসবের প্রভাব পড়েছে নিত্যপণ্যের বাজারে। প্রয়োজনীয় পণ্যবাহী যানবাহন নিষেধাজ্ঞার বাইরে থাকলেও বাস্তবে পরিবহন সঙ্কট, বাড়তি ভাড়া এবং সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। এতে সবজি, পেঁয়াজ ও মুরগির দামে ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে। ভোটের আগের তুলনায় বেশির ভাগ সবজির দাম কেজিতে ১০-২০ টাকা বেড়েছে; কাঁচামরিচ বেড়েছে প্রায় ৪০ টাকা। পেঁয়াজ কেজিতে ১০ টাকা এবং ব্রয়লার মুরগি ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, সরবরাহ কমেছে, পরিবহন ব্যয় দেড় থেকে দ্বিগুণ হয়েছে, তাই দামও বেড়েছে। বাজার বিশ্লেষকেরাও মনে করছেন, এটি সাময়িক সরবরাহ ঘাটতির ফল। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বাড়তি দামের এই ‘সাময়িক’ সময় কী রমজান পর্যন্ত টেনে নিয়ে যাওয়া হবে? রমজান শুরু হতে আর মাত্র দিন কয়েক বাকি। এ মাস মুসলমানদের জন্য সংযম, আত্মশুদ্ধি ও সহমর্মিতার। অনেক মুসলিম দেশে রমজান সামনে রেখে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে বিশেষ উদ্যোগ নেয়া হয়। কোথাও ভর্তুকি দেয়া হয়, কোথাও নির্দিষ্ট পণ্যে মূল্যছাড় ঘোষণা করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশে বরাবর দেখা যায়, উল্টো চিত্র। রমজান যত ঘনিয়ে আসে, বাজারে তত বাড়তে থাকে দ্রব্যমূল্য।
এবারো এর লক্ষণ ফুটে উঠছে। ভোট-পরবর্তী সরবরাহ সঙ্কটকে পুঁজি করে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী যদি বাজারে অস্থিরতা তৈরি করেন, তাহলে রমজানে এর প্রভাব তীব্র হবে। ব্যবসায়ী সংগঠন থেকে আশ্বাস দেয়া হয়েছিল- রমজানে পণ্যের দাম বাড়বে না। কিন্তু ঘোষণার কয়েক দিনের মধ্যে বাজারে মূল্যবৃদ্ধি সেই আশ্বাসকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো ‘সিন্ডিকেটের’ তৎপরতা। অতীতে বহুবার দেখা গেছে, সামান্য সরবরাহ ঘাটতি বা প্রশাসনিক শিথিলতা কাজে লাগিয়ে একটি গোষ্ঠী বাজারে কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করেছে। ভোটের কারণে পরিবহন ব্যয় বেড়েছে, এ যুক্তি সাময়িকভাবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে। কিন্তু পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পরও যদি দাম না কমে, সেটি হবে সুস্পষ্ট কারসাজি। তাই সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো এখনই সক্রিয় না হলে পরিস্থিতি সামাল দেয়া কঠিন হবে। পাইকারি ও খুচরা বাজারে নিয়মিত তদারকি, মজুদ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। বিশেষ করে পেঁয়াজ, মুরগি, কাঁচামরিচসহ রমজানে বেশি চাহিদাসম্পন্ন পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখতে সমন্বিত উদ্যোগ দরকার।
রমজান সংযমের মাস, এ সময়ে ব্যবসায়ীদেরও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেয়া উচিত। অতি মুনাফার লোভে সাধারণ মানুষের কষ্ট বাড়ানো নৈতিকতার পরিপন্থী। বাজার স্থিতিশীল রাখা কেবল সরকারের একার কাজ নয়; ব্যবসায়ী সমাজেরও দায়বদ্ধতা আছে।
নির্বাচন শেষ, রাজনৈতিক উত্তাপও কমে আসছে। এখন সময় অর্থনৈতিক স্থিতি ফিরিয়ে আনার। ভোটের ছুটিতে যে মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে, তার লাগাম দ্রুত টানতে না পারলে সিন্ডিকেট আরো সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে। সঙ্গতকারণে রমজানের আগেই বাজার স্থিতিশীল করা গেলে সাধারণ মানুষের স্বস্তি ফিরবে। না হয় ভোগান্তির বোঝা আরো ভারী হবে, যা কোনোভাবে কাম্য নয়।



