কারিগরি শিক্ষার মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ দ্রুত উন্নতির পথে এগিয়ে যাচ্ছে। সেখানে আমাদের দেশে কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৭৩ শতাংশ শিক্ষকের পদ শূন্য। এ থেকে স্পষ্ট, দেশে কারিগরি শিক্ষা চরম অবহেলার শিকার। অথচ রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারক ব্যক্তিরা বক্তব্য-বিবৃতিতে সবসময়ই কারিগরি শিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরেন। কারিগরি শিক্ষায় শুধু শিক্ষক-সঙ্কট নয়, উপকরণের অভাব, দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও অনুন্নত কারিকুলামের কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো রীতিমতো বেহাল অবস্থায় রয়েছে। এটি দুঃখজনক। বিগত সরকারের সময় দেশে সরকারি ও বেসরকারি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে; কিন্তু শিক্ষার মানোন্নয়নের পরিবর্তে নিম্নমুখী হয়েছে। ফলে এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষা নিয়ে শিক্ষার্থীরা শ্রমবাজারে কাঙ্ক্ষিত দক্ষতা দেখাতে পারছে না। অনেকে বেকার থাকছে। বর্তমানে কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৪৪ শতাংশ শিক্ষার্থীই ঝরে পড়ছে। এসব তথ্য উঠে এসেছে খোদ বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনে।
বলা হচ্ছে, বেশির ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এক শিফটের শিক্ষক দিয়ে চালানো হচ্ছে দুই শিফটের কাজ। অনেক প্রতিষ্ঠানে ল্যাবরেটরি নেই। আবার ল্যাব থাকলেও নেই প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থা আরো নাজুক। দেশে ১২ হাজারের বেশি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে। তার মধ্যে ৩৮৭টি বেসরকারি পলিটেকনিক। এর মধ্যে ২০ থেকে ২৫টি ছাড়া বাকি সবই নামসর্বস্ব।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিধ্বস্ত জাপান ও জার্মানির ঘুরে দাঁড়ানোর চালিকাশক্তি ছিল কারিগরি শিক্ষা। অন্য দিকে দক্ষিণ কোরিয়া, ভিয়েতনাম কিংবা চীনের মতো দেশের উন্নতিতেও মূল ভূমিকা রেখেছে কারিগরি শিক্ষা।
বাংলাদেশে কারিগরি শিক্ষা অনেক আগে চালু হলেও একে যুগোপযোগী করা যায়নি। ল্যাবরেটরি ছাড়া কারিগরি শিক্ষা অর্জন অসম্ভব। অথচ দেশে সেটিই ঘটছে। কারিগরি দক্ষতাসম্পন্ন জনবল তৈরি হচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে বিদ্যমান সমস্যার অবিলম্বে নিরসন জরুরি। প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞসহ সংশ্লিষ্টদের নিয়ে কমিটি গঠন করা যেতে পারে। কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিতদের বেকার থাকারও কোনো কারণ নেই। দেশে শিল্পায়ন বাড়ছে। বিদেশে তাদের কর্মসংস্থানের যথেষ্ট সুযোগ আছে; কিন্তু কোনো সম্ভাবনাই কেন কাজে লাগানো যাচ্ছে না, তা খতিয়ে দেখা দরকার।
কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৭৩ শতাংশ শিক্ষক-সঙ্কট নিশ্চয়ই এক দিনে তৈরি হয়নি। বছরের পর বছর এ বিষয়ে নজর না দেয়াই এর কারণ। শূন্য পদে শিক্ষক নিয়োগ ও শিক্ষার্থীদের দক্ষতা অর্জনের সবরকম সুযোগ তৈরি করা দেশ ও জাতির জন্যই জরুরি। এ ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা অনাকাঙ্ক্ষিত।
জনসংখ্যা দেশের বোঝা নয়। সমস্যা হলো— একে জনসম্পদে রূপান্তর করতে না পারা। এটি করার সবচেয়ে বড় উপায় হতে পারে কারিগরি শিক্ষা। এই শিক্ষা খাতে শিক্ষক-সঙ্কটসহ যত সমস্যা আছে তা অবিলম্বে দূর করতে হবে। উন্নত কারিকুলাম ও প্রয়োজনীয় উপকরণের জোগান নিশ্চিত করতে হবে। কারিগরি শিক্ষা সম্পর্কে জনমনে যে উন্নাসিকতার ভাব আছে, তা-ও দূর করতে হবে।
কারিগরি শিক্ষার প্রতি মানুষকে আগ্রহী করে তুলতে হলে এই শিক্ষার অর্থনৈতিক সম্ভাবনা সামনে আনতে হবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সক্রিয় করে তুলতে এবং জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। সে দায়িত্ব সরকারের।



