বাংলাদেশে বহিঃবাণিজ্যের লাইফলাইন চট্টগ্রাম বন্দর। আমদানি-রফতানির ৯২ শতাংশ সম্পন্ন হলেও উপযুক্ত গুরুত্ব পায়নি। বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী মহল বন্দর কার্যক্রম কব্জা করে নিজেদের ফায়দা তুলে নিয়েছে। চাঁদাবাজি, বখরা আদায়, সিন্ডিকেটের কবলে পড়ে ধুঁকে ধুঁকে এর কার্যক্রম চালাতে হয়েছে। বিভিন্ন সময় সরকার একে এ অশুভ চক্রের হাত থেকে উদ্ধারের চেষ্টা করেও সফল হয়নি। এবার ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার শুরু থেকে চট্টগ্রাম বন্দর সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। দফায় দফায় শক্তিশালী সিন্ডিকেটের প্রতিরোধেও হাল ছাড়েনি। শেষপর্যন্ত বন্দরটি কিছুটা পরিবর্তনের ধারায় ফিরেছে। বছর শেষে বন্দর পরিচালনায় দক্ষতার খবর মিলেছে।
বন্দর পরিচালনার সক্ষমতার বৈশ্বিক তালিকায় চট্টগ্রাম একেবারে শেষে। সরকারের নানামুখী চেষ্টা উদ্যোগে ২০২৫ সালে তা নড়েচড়ে উঠেছে। কনটেইনার ও কার্গো হ্যান্ডলিং এবং জাহাজ খালাসে গত বছর অগ্রগতি হয়েছে। বন্দর পরিচালনা থেকে আয় বেড়েছে, রাষ্ট্রীয় কোষাগারে লাভের বাড়তি অর্থ জমা হয়েছে। গত বছর বন্দরে ৩৪ লাখ ৯ হাজার ৬৯টি কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়। আগের বছর হয়েছিল ৩২ লাখ ৭৫ হাজার। আগের বছরের তুলনায় এক লাখ ৩৩ হাজার টিইইউএস কনটেইনার বেশি হ্যান্ডলিং হয়। প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪ দশমিক ০৭ শতাংশ।
কার্গো হ্যান্ডলিং হয়েছে ১৩ কোটি ৮২ লাখ ৫১ হাজার ৮১২ টন। আগের বছরের চেয়ে এক কোটি ৪১ লাখ ৬৮ হাজার টন কার্গো বেশি। প্রবৃদ্ধি ১১ দশমিক ৪৩ শতাংশ। একই সময়ে বন্দরে জাহাজ ভিড়েছে চার হাজার ২৭৩টি। আগের বছরের চেয়ে ৪০৬টি বেশি। প্রবৃদ্ধি ১০ দশমিক ৫০ শতাংশ। তিন ক্ষেত্রে বন্দরের কার্যক্রম রেকর্ড বেড়েছে। গত বছর বন্দর কর্তৃপক্ষ আয় করেছে পাঁচ হাজার ৪৬০ কোটি ১৮ লাখ টাকা। ব্যয় মিটিয়ে রাষ্ট্র্রীয় কোষাগারে জমা হয়েছে এক হাজার ৭০৪ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। আয় আগের বছরের চেয়ে ৪০৫ কোটি টাকা বেড়েছে।
বন্দর আধুনিকীকরণে অন্তর্বর্তী সরকার বড় ধরনের সংস্কারের চেষ্টা চালানোর মধ্যে নানাবিধ বাধার মুখে পড়েও হাল ছেড়ে দেয়নি, এতে ফলও মিলছে। অনলাইনে ফি পরিশোধ ও গেটপাসের নিয়ম কার্যকর হয়েছে। ২৪ ঘণ্টা সপ্তাহে সাত দিন যেকোনো স্থান থেকে ফি পরিশোধ করে গেটপাস নেয়া যাচ্ছে। এতে সময় ও অর্থ দু’টিই সাশ্রয় হচ্ছে। গত ২৩ ডিসেম্বর এক দিনে সর্বোচ্চ ছয় হাজার ৭৪১টি গেটপাস ইস্যু রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে। সমসংখ্যক লরি, ট্রাক, কাভার্ডভ্যানসহ বিভিন্ন গাড়ি বন্দরে প্রবেশ করে মালামাল খালাস করতে পেরেছে। এতে লাল ফিতার দৌরাত্ম্য কমিয়ে বন্দরে গতি বাড়ানো গেছে। গত বছর সরকার ৭০ হাজার বর্গমিটার ইয়ার্ড নির্মাণ করেছে। ৩৫টি অত্যাধুনিক যন্ত্র স্থাপন করা হয়েছে। সবকিছু মিলিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর আধুনিক ব্যস্ত একটি বন্দর হতে চলেছে।
বিকল্প সমুদ্রবন্দর তৈরি না করতে পারার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় স্থলবন্দর ও বিমানবন্দর না থাকায় চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর দেশের আমদানি-রফতানি প্রধানত নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় অন্য সুবিধা তৈরি না হওয়া পর্যন্ত এ বন্দরের কার্যক্রমে গতি আনার কোনো বিকল্প নেই। অন্তর্বর্তী সরকারের নেয়া বন্দরকেন্দ্রিক সংস্কার কার্যক্রম এখন পর্যন্ত ইতিবাচক ধারায় পরিচালিত হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর উচিত সরকারের সংস্কার উদ্যোগকে যথাযথ সহযোগিতা দিয়ে এগিয়ে নেয়া।



