দেবে যাচ্ছে বরিশাল নগরী

পদক্ষেপ না নিলে মূল্য দিতে হবে

বরিশাল আজ যে সতর্কসঙ্কেত দিচ্ছে, তা কেবল একটি শহরের সমস্যা নয়; বাংলাদেশের অন্যান্য নগরীর জন্যও বার্তা। এখনই যদি আমরা সচেতন না হই, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এর মূল্য দিতে হবে।

নীরব বিপদের মুখে দাঁড়িয়ে আছে প্রাচ্যের ভেনিসখ্যাত নগরী বরিশাল। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য— প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১.৬৬ মিলিমিটার করে নিচে দেবে যাচ্ছে এই নগরী। কোনো কোনো বছরে এক ইঞ্চি পর্যন্ত দেবে যাচ্ছে। সংখ্যাগুলো আলাদা করে দেখলে ছোট মনে হতে পারে। বাস্তবে নদী-খালঘেরা এই শহর যদি প্রতিনিয়ত এভাবে দেবে যেতে থাকে, তাহলে একসময় মানচিত্র থেকে শহরটি হারিয়ে যেতে পারে।

জার্মানির সহায়তায় গবেষণাটি করেছে বাংলাদেশ ভূ-তাত্ত্বিক জরিপ অধিদফতর ও ফেডারেল ইনস্টিটিউট ফর জিওসায়েন্স অ্যান্ড ন্যাচারাল রিসোর্সেস। এই গবেষণা থেকে পাওয়া তথ্য নিছক কোনো সতর্কবার্তা নয়, এটি এক ধরনের নীরব বিপর্যয়ের পূর্বাভাস। শহর দেবে যাওয়ার প্রভাব ইতোমধ্যে দৃশ্যমান হয়েছে। হেলে পড়ছে নগরীর ভবন, বদলে যাচ্ছে এর ভূ-প্রকৃতি।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো— এই বিপর্যয় চোখে পড়ে না। নীরবে মাটির নিচে ফাঁপা স্তর তৈরি হচ্ছে। ফলে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যথাযথভাবে জরুরি অনুভূতিটিও তৈরি হচ্ছে না। অথচ স্যাটেলাইট চিত্র থেকে শুরু করে মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণ স্পষ্ট করে দিচ্ছে, সমস্যা ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে।

এই পরিস্থিতি কোনো আকস্মিক প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে সৃষ্টি হয়নি। মানুষের অবিবেচক কর্মকাণ্ডের ফলেই এই বিপর্যয় নেমে আসছে। অপরিকল্পিত নগরায়ন এবং ভূ-গর্ভস্থ পানির বেপরোয়া উত্তোলন— এই দুই কারণকে বিশেষজ্ঞরা দায়ী করছেন। একদিকে উচ্চ ভবনের চাপ, অন্যদিকে পানির স্তর নিচে নামার ফলে মাটির অভ্যন্তরে শূন্যতা তৈরি হচ্ছে।

সমস্যাটির গুরুত্ব অনুধাবনে সময়ের পরিসরটি গুরুত্বপূর্ণ। আজকের ক্ষুদ্র পতন আগামী ৫০ বা ১০০ বছরে পরিণত হতে পারে বড় বিপর্যয়ে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং ভূমির নিম্নগামিতা মিলিয়ে বরিশাল একসময় প্লাবনের ঝুঁকিতে পড়তে পারে। তখন সামান্য জোয়ারই হয়ে উঠতে পারে নগরডুবির কারণ।

তাই এখন থেকে ভূ-গর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমিয়ে আনতে হবে। বিকল্প হিসেবে পুকুর, নদী ও খালের পানি পরিশোধনের মাধ্যমে ব্যবহার করতে হবে। নগর পরিকল্পনায় কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে হবে। ভবন নির্মাণের আগে বাধ্যতামূলকভাবে ভূ-তাত্ত্বিক সমীক্ষা নিশ্চিত করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় উচ্চ ভবন নির্মাণ সীমিত করতে হবে। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের সুবিধা তৈরি করতে হবে। নগরীর খাল ও জলাধারগুলো পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণ করাও জরুরি। এগুলো প্রাকৃতিক পানি ধারণক্ষমতা বাড়াবে। পরিবেশের ভারসাম্যও রক্ষা করবে। পাইপলাইনের মাধ্যমে নিরাপদ পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারলে ব্যক্তিগত টিউবওয়েলের ওপর নির্ভরতা কমে আসবে।

সহযোগী একটি দৈনিকের খবরে জানানো হয়েছে, এই গবেষণার ফলাফল সর্বসাধারণের জন্য প্রকাশ করেনি ভূ-তাত্ত্বিক জরিপ অধিদফতর। তবে বিষয়টি বরিশাল সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। কিন্তু এই গবেষণার ফলাফল জনসমক্ষে প্রকাশ করা এবং সেটি নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করা জরুরি। সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, বিশেষজ্ঞ এবং নাগরিক সমাজকে এ জন্য একসাথে কাজ করতে হবে।

বরিশাল আজ যে সতর্কসঙ্কেত দিচ্ছে, তা কেবল একটি শহরের সমস্যা নয়; বাংলাদেশের অন্যান্য নগরীর জন্যও বার্তা। এখনই যদি আমরা সচেতন না হই, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এর মূল্য দিতে হবে।