স্বাগত নতুন সরকার

জনকল্যাণ হোক ব্রত

তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত মন্ত্রিসভা গতকাল শপথ নিয়েছে। এর মাধ্যমে নতুন বাংলাদেশে ফের গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় নির্বাচিত সরকারের আনুষ্ঠানিক পথচলা শুরু হলো।

চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার পতনের পর একটি অবাধ-সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন করে গণতান্ত্রিক ধারার সুযোগ পেয়েছি আমরা। দেশী-বিদেশী সব ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার গত ১৭ মাসে রাষ্ট্র সংস্কার এবং একটি অবাধ-সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনে প্রাণপণ প্রচেষ্টা চালিয়েছে। অবশেষে ১২ ফেব্রুয়ারি কাঙ্ক্ষিত ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়েছে। এবারের নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ২১২ আসনে জয়ী হয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। পাশাপাশি জামায়াত এককভাবে ৬৮টি এবং জোটগতভাবে ৭৭টি আসনে জয় পেয়ে সংসদে শক্তিশালী বিরোধী দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এবারের নির্বাচনের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো— ফ্যাসিবাদে বিশ্বাসী কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নির্বাচনে অংশ নিতে না পারা। বিগত ১৫ বছরে দলটির প্রধান ও নেতাকর্মীদের অপরাধের বিচার চলমান। এ ধারা আগামী দিনগুলোতে যেন আরো জোরদার হয়।

অতীতে দেশে সরকারি এবং বিরোধী দলের পারস্পরিক সম্পর্ক ছিল শত্রুতাপূর্ণ। অথচ সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় বিরোধী দলও পরোক্ষভাবে সরকারের অংশ। আমরা আশা করব, নতুন সরকার বৈরিতার সংস্কৃতি পরিহার করে বিরোধীদের প্রতি সম্মান ও সহনশীলতার পরিচয় দিয়ে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের শক্ত ভিতে দাঁড় করাবে। অন্যদিকে সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে বিরোধী দল সংসদে সোচ্চার ভূমিকা নেবে। গঠনমূলক সমালোচনায় জনস্বার্থ রক্ষায় সোচ্চার থাকবে। আইন প্রণয়ন, বাজেট বিতর্ক এবং প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে সংসদকে প্রাণবন্ত করে তুলবে।

নতুন সরকারের কাছে জনপ্রত্যাশা হলো সুশাসন, দুর্নীতিমুক্ত ও জবাবদিহিমূলক শাসন প্রতিষ্ঠা। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও নাগরিক অধিকার সমুন্নত রাখা। ভঙ্গুর অবস্থায় থাকা রাষ্ট্র মেরামত, পুনর্গঠন ও যথাযথ সংস্কার করা না হলে সামনে অগ্রসর হওয়া যাবে না। দুর্বল অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা বিশাল চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে। নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে দুষ্টচক্রকে পর্যুদস্ত করার পাশাপাশি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সমাধান দিতে হবে। দায়িত্ব নিয়ে প্রথম দিন থেকে সরকারকে সতর্কতা ও বুদ্ধিমত্তার সাথে পথ চলতে হবে।

সামাজিক স্থিতিশীলতা আনতে আইনশৃঙ্খলার উন্নতি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের আধুনিকায়ন, প্রত্যেকটি সূচকে টেকসই উন্নয়নে মনোনিবেশ করতে হবে। দুর্নীতির কাঠামো ভেঙে জবাবদিহিমূলক ও স্বচ্ছ প্রশাসন নিশ্চিত করতে হবে নতুন সরকারকে।

গণতান্ত্রিক সংস্কারে ভোটাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতায় প্রতিহিংসার রাজনীতি ভুলে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে ঐক্যবদ্ধ কাজের পরিবেশ তৈরি এখন সময়ের দাবি। এক্ষেত্রে জন-অভিপ্রায় অনুযায়ী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

নতুন সরকারের প্রতি মানুষের মূল চাওয়া শান্তিপূর্ণ, বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক একটি ‘নতুন বাংলাদেশের’ যাত্রা শুরুর কার্যকর উদ্যোগ নেয়া। এটি একটি দেশের পক্ষে তখনই অর্জন করা সম্ভব— যখন সুশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, আইনের শাসন, দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং জন-অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা যাবে। এসব কিছু পরিপূর্ণ বাস্তবায়নে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সামাজিক সচেতনতা অত্যাবশ্যক। তবে সবার আগে নতুন সরকারকে জনপ্রত্যাশা বুঝতে হবে।

পরিশেষে, নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার মন্ত্রিসভার সব সদস্যকে প্রাণঢালা অভিনন্দন, শুভেচ্ছা ও স্বাগত।