স্থানীয় সরকারে অনির্বাচিতদের নিয়োগ

তৃণমূলে গণতন্ত্র দুর্বল করবে

স্থানীয় সরকারব্যবস্থায় গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অক্ষুণ্ন রাখা জরুরি। কোনোভাবে এমন পদক্ষেপ নেয়া উচিত নয়, যা জনগণের ভোটাধিকার ও অংশগ্রহণ খর্ব করে। প্রয়োজন নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ক্ষমতা ও দক্ষতা বাড়ানো, যাতে তারা কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন।

মানুষের আশা ছিল সংসদ নির্বাচনের পর দেশে স্বাভাবিক পরিস্থিতি থাকায় নতুন সরকার স্থানীয় সরকার নির্বাচন দ্রুত আয়োজন করবে, যাতে তৃণমূলে গণতন্ত্র দৃঢ় ভিত্তি পায়। এতে করে বিগত দিনে স্থানীয় সরকারে যে স্থবিরতা দেখা দিয়েছিল, তা কেটে যাবে। কিন্তু বর্তমান সরকার সেদিকে না গিয়ে স্থানীয় সরকারে দলীয় লোকদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিচ্ছে। ইতোমধ্যে ১১টি সিটি করপোরেশন ও ৪২টি জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে। যাদের এসব পদে নিয়োগ দেয়া হয়েছে, তারা সবাই বিএনপি নেতা। তাদের কেউ সদ্য অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে হেরেছেন অথবা মনোনয়ন পাননি। প্রশাসক নিয়োগ দিয়ে তাদের পুনর্বাসন করা হচ্ছে।

সবার নিশ্চয়ই মনে আছে, অন্তর্বর্তী সরকার সংসদ নির্বাচনের আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের উদ্যোগ নিতে চাইলে বিএনপি বিরোধিতা করেছিল। নির্বাচনের দিকে না গিয়ে স্থানীয় সরকারে এভাবে প্রশাসক নিয়োগ দেয়ার কড়া সমালোচনা করেছে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি। দল দু’টির নেতারা বলেছেন, প্রশাসক নিয়োগ দিয়ে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে দলীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে সরকার। এর মাধ্যমে ক্ষমতাসীন দল স্থানীয় নির্বাচনে সুবিধা নিতে চায়।

স্থানীয় সরকারব্যবস্থা দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। জনগণের নিকটতম প্রশাসনিক স্তর হিসেবে এটি সরাসরি মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার সাথে সম্পর্কিত। তাই স্থানীয় সরকারব্যবস্থায় অনির্বাচিতদের নিয়োগ গণতান্ত্রিক চর্চায় গভীর উদ্বেগের বিষয়। তৃণমূল পর্যায়ে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা সব সময় সাধারণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটান। তাদের সাথে নাগরিকদের থাকে নিবিড় সম্পর্ক। সেখানে অনির্বাচিত ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তি শুধু সরকার-ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নয়, গণতান্ত্রিক চেতনাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে।

গণতন্ত্রের ভিত্তি হলো জনমত। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো, যেমন— ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা সিটি করপোরেশন জনমত প্রতিফলনের সবচেয়ে কাছাকাছি স্তর। এখানে জনগণ সরাসরি তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করেন। সেই প্রতিনিধির মাধ্যমে নিজেদের সমস্যা ও চাহিদা তুলে ধরেন। এখানে অনির্বাচিত ব্যক্তিদের নিয়োগ দেয়া হলে জনগণের অধিকার ক্ষুণ্ন করা হয়।

অনির্বাচিত ব্যক্তিদের নিয়োগ রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ায়। এতে যোগ্যতা ও জনগণের আস্থার পরিবর্তে ক্ষমতার নৈকট্য হয়ে ওঠে নিয়োগের প্রধান মানদণ্ড। ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা কমে যায়, জবাবদিহির অভাব দেখা দেয়। বাস্তবতা হলো, যারা জনগণের ভোটে নির্বাচিত নন, নাগরিকদের প্রতি তাদের সরাসরি কোনো দায়বদ্ধতা থাকে না। এই প্রবণতা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকা দুর্বল করে দেয়। তাদের সিদ্ধান্ত ও কর্তৃত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হয়, যা প্রশাসনিক দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করতে পারে। ফলে উন্নয়নকার্যক্রমে স্থবিরতা নেমে আসে। পরিণামে জনগণ প্রত্যাশিত সেবা থেকে বঞ্চিত হন।

স্থানীয় সরকারব্যবস্থায় গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অক্ষুণ্ন রাখা জরুরি। কোনোভাবে এমন পদক্ষেপ নেয়া উচিত নয়, যা জনগণের ভোটাধিকার ও অংশগ্রহণ খর্ব করে। প্রয়োজন নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ক্ষমতা ও দক্ষতা বাড়ানো, যাতে তারা কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন।