ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্পে সঙ্কট

বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করুন

জাতীয় তাঁতি সমিতির নেতারা এই সমস্যার আশু সমাধান চেয়েছেন। বিদ্যুতের সমস্যা শুধু সিরাজগঞ্জের তাঁতশিল্পের নয়; এটি জাতীয় সঙ্কট। এটি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের সাথে সম্পর্কিত। কারণ জ্বালানির অভাবে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। গোটা শিল্প খাতে স্থবিরতা দেখা দিচ্ছে। বিষয়টি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে সমাধান করা জরুরি। জ্বালানির বিকল্প উৎস খুঁজে বের করে শিল্প চালু রাখার ব্যবস্থা করতে হবে এবং তা এখনই।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানির অভাবে মারাত্মক সঙ্কটে ভুগছে সিরাজগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্প। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুতের লোডশেডিং এই মুহূর্তের সবচেয়ে বড় সমস্যা। বিদ্যুতের অভাবে শ্রমিকরা কাজ করতে পারছে না। তারা কারখানার বাইরে বসে কেউ লুডু খেলে, গান শুনে অথবা যেনতেন করে অলসভাবে সময় কাটাচ্ছে। অনেক মালিক ডিজেল-চালিত জেনারেটরে কাজ চালু রাখার চেষ্টা করছেন। তাতে ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে অন্তত চারগুণ। আবার অতিরিক্ত দাম দিয়েও প্রায়ই ডিজেল মিলছে না। ছোট তাঁতকল মালিকদের পক্ষে এত বিপুল ব্যয় সঙ্কুলানও অসম্ভব হয়ে পড়ছে। বড় কারখানার মালিকরা বাড়তি উৎপাদনের কারণে ব্যয়ের বোঝা সামাল দিতে পারলেও প্রান্তিক তাঁতি বা ছোট তাঁতকলের মালিকরা হিমশিম খাচ্ছেন। তাদের উৎপাদন অর্ধেকে নেমে গেছে। অনেক তাঁতকল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

গণমাধ্যমের খবরে জানা যাচ্ছে, বিদ্যুৎচালিত পাওয়ার লুমে একটি জামদানি শাড়ি উৎপাদনে ব্যয় হয় ৪০ টাকা। ডিজেল জেনারেটরে সেই শাড়ি বুনতে ব্যয় চারগুণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬০ টাকা। এই আর্থিক ক্ষতির ধকল ক্ষুদ্র তাঁতকলের মালিকরা সইতে পারছেন না। কেউ কেউ ব্যাংক ঋণ নিয়ে টিকে থাকার চেষ্টা করছেন; কিন্তু এটি কোনো স্থায়ী সমাধান নয়।

সিরাজগঞ্জ খ্যাত তাঁতকুঞ্জ নামে। জেলার ৯টি উপজেলার ১০ লাখের বেশি মানুষ নানাভাবে তাঁতশিল্পের সাথে জড়িত। অসচ্ছল নারী-পুরুষ থেকে শিশু এমনকি বৃদ্ধরাও এই পেশার সাথে সম্পৃক্ত। জেলার বেশির ভাগ মানুষই তাঁতিদের তৈরি কাপড়ের ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল। পাওয়ার লুম ও হ্যান্ডলুম মিলিয়ে প্রায় পাঁচ লাখ তাঁত আছে জেলায়। এসব তাঁতে যথেষ্ট উন্নতমানের কাপড় তৈরি হচ্ছে। সিরাজগঞ্জের তাঁতের শাড়ি, লুঙ্গি ও গামছার চাহিদা শুধু দেশে নয় বিদেশেও যথেষ্ট। বিদেশে এর বড় বাজার আছে। প্রতি বছর ভারতীয় পাইকাররা এসে এখানকার হাট থেকে তাঁতের কাপড় কিনে নিয়ে যান। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ভারত ট্রান্সশিপমেন্ট বন্ধ করে দেয়ায় কাপড় রফতানি প্রায় বন্ধ হয়ে আছে।

এ ছাড়াও বিদ্যুতের অভাব, কাঁচামালের বাড়তি দাম, বাজারে অস্থিরতা, নীতিগত সমস্যাসহ নানা কারণে ঐতিহ্যবাহী এই শিল্প এখন অস্তিত্ব সঙ্কটে। এর ফলে কেবল ক্রেতারা বঞ্চিত হবেন না, এই শিল্পের সাথে সংশ্লিষ্ট অন্তত ১০ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা হুমকিতে পড়বে। এই মুহূর্তে অন্য সবকিছুর চেয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ে ভাবতে হবে।

জাতীয় তাঁতি সমিতির নেতারা এই সমস্যার আশু সমাধান চেয়েছেন। বিদ্যুতের সমস্যা শুধু সিরাজগঞ্জের তাঁতশিল্পের নয়; এটি জাতীয় সঙ্কট। এটি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের সাথে সম্পর্কিত। কারণ জ্বালানির অভাবে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। গোটা শিল্প খাতে স্থবিরতা দেখা দিচ্ছে। বিষয়টি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে সমাধান করা জরুরি। জ্বালানির বিকল্প উৎস খুঁজে বের করে শিল্প চালু রাখার ব্যবস্থা করতে হবে এবং তা এখনই।