দারিদ্র্যপীড়িত বাংলাদেশে অবহেলিত অংশ পথশিশুরা। তাদের দেখা মেলে শহরের রাস্তায় ফুটপাথে। অবহেলা অনাদরে লাঞ্ছনায় তারা বেড়ে ওঠে। এরা সাধারণ পিতৃ-মাতৃহীন বা পরিচয়হীন। কিছু ক্ষেত্রে মা-বাবা ও আত্মীয় থাকলেও পরিবার থেকে তারা পরিত্যক্ত। পথশিশু বলা হলেও তাদের মধ্যে যুবক ও মধ্যবয়সী লোকদেরও দেখা যায়। স্বামী পরিত্যক্ত মাকে দেখা যায় সন্তানসহ। রাজধানী ঢাকায় বড়দাগে তাদের দেখা গেলেও দেশের অন্যান্য শহর নগরেও উপস্থিতি আছে। পথশিশুদের নিয়ে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন উদ্যোগ থাকলেও এই ভাগ্যবঞ্চিত জনগোষ্ঠী বিপুল সংখ্যায় এখনো পথেই রয়ে গেছে।
পথশিশুদের নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে নয়া দিগন্ত। প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে রাজধানীর সড়ক ও ফুটপাথ ঘুরে। মেট্রোরেল উড়ালসড়কসহ শহরের বড় বড় স্থাপনার নিচে তাদের আস্তানা। রাস্তার ধারে পার্কে পরিত্যক্ত জায়গায় খোলা আকাশের নিচে থাকে এই শিশুরা। সড়ক বিভাজক কিংবা সড়কের পাশে যানবাহনের হাঁকডাকের মধ্যে শুয়ে-বসে থাকে। পলিথিন কিংবা অন্য কোনো জিনিস দিয়ে কেউ কেউ কিছুটা আড়াল নিলেও বেশির ভাগের অবস্থান হয় খোলা আকাশের নিচে। একেবারে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে গাদাগাদি করে বসবাস তাদের। শহরের ভয়াবহ ধূলিদূষণের শিকার হয় তারা। বিশুদ্ধ পানি স্বাস্থ্যসম্মত খাবারের দেখা মেলে না এই শিশুদের। এতে বিভিন্ন রোগ বাসা বাঁধে তাদের শরীরে। মেয়ে শিশুরা এ ধরনের পরিবেশে একেবারে অরক্ষিত। তারা নানাভাবে উত্ত্যক্ত ও যৌন হয়রানির শিকার হয়।
যেই বয়সে তাদের স্নেহ-মমতায় পারিবারিক পরিবেশে বেড়ে ওঠার কথা, সেই বয়সে অবহেলা ও নিষ্ঠুরতার শিকার হয়। তাদের জন্য থাকে না শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ। শহরের রাস্তায় কুড়ানো ও ভিক্ষাবৃত্তি প্রধানত তাদের পেশা। অনেকে সারা দিন খাটুনি করে খুব সামান্য আয় করে। যা দিয়ে নিজেদের খাবারের পয়সা জোটানো দায়। এর ওপর তাদের বড় একটি অংশ মাদকাসক্ত। গাঁজা, সিগারেট, মদ এবং জুতার আঠার মতো একেবারে নিম্নমানের মাদক সেবন করে। পথশিশুদের বেশির ভাগই কোনো না কোনো রোগে আক্রান্ত।
ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৩৪ লাখ পথশিশু রয়েছে। তাদের এক-তৃতীয়াংশ মেয়ে। তাদের বড় অংশ ঢাকা বিভাগে। অন্য এক জরিপে দেখা গেছে, ৯৫ দশমিক ৫ শতাংশ পথশিশু প্রাতিষ্ঠানিক বা অপ্রাতিষ্ঠানিক কোনো শিক্ষাই তারা পায় না। তাদের বেশির ভাগ মানসিক, শারীরিক ও যৌন নিপীড়নের শিকার। নানাভাবে দমিত হয়ে এদের মধ্যে থেকে নিষ্ঠুর চরিত্রের অপরাধীরা জন্ম নেয়। শহরের দাগি মাস্তান খুনি স্বভাবের একটি অংশ পথশিশুদের মধ্য থেকে আসে।
একটি স্বাধীন দেশে কোনোভাবে পথশিশু থাকার কথা নয়। আমাদের দেশে স্বাধীনতার পর থেকে এদের দেখতে পাওয়া যায়। তাদের সংখ্যা আগের চেয়ে বেড়েছে। তাদের টোকাই নাম দেয়া হয়েছে। এ নিয়ে বহু সাহিত্য রচনা হয়েছে। কিন্তু তারা একটি সুষ্ঠু সুন্দর জীবন পায়নি।
এই পথশিশুদের ভরণ পোষণ দিয়ে শিক্ষার ব্যবস্থা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। ধনাঢ্য ব্যক্তিরাও তাদের আশ্রয় দিতে এগিয়ে আসতে পারেন।



