ইউরোপে নজিরবিহীন তাপপ্রবাহ

বিশ্বের জন্য সতর্কবার্তা

সমস্যার সমাধান যে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির হার শূন্যে নামানোর ওপর নির্ভরশীল সেটি সবাইকে বুঝতে হবে। সে জন্য কার্যকর ব্যবস্থাও নিতে হবে।

ইউরোপজুড়ে চলছে নজিরবিহীন তাপপ্রবাহ। কয়েকটি দেশে তাপমাত্রা নতুন রেকর্ড ছুুঁয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, তাপমাত্রাজনিত কারণে এক হাজার ৩০০-এর বেশি মানুষ মারা গেছে। শীতপ্রধান ইউরোপে এ এক অবিশ্বাস্য পরিস্থিতি। কারণ যে মহাদেশে গ্রীষ্মে তাপমাত্রা সচরাচর ২৮ ডিগ্রির মধ্যে থাকে সেখানে তাপমাত্রা ৪১ ডিগ্রির উপরে উঠে যাওয়া রীতিমতো প্রাণঘাতী। অনেকে হৃদরোগে আক্রান্ত হচ্ছে, কেউ বা নদীতে নেমে শরীর ঠাণ্ডা করার চেষ্টা করতে গিয়ে ডুবে মরছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছুটি দেয়া হয়েছে এবং বিদ্যুতের গ্রিডগুলো বিকল হয়ে পড়ছে। জীবনযাত্রা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে।

ইউরোপের ঘরবাড়ি, স্কুল ইত্যাদি সব শীতল আবহাওয়ার উপযোগী করে তৈরি। সে জন্য তারা এবারের চরম উত্তাপ সহ্য করতে পারছে না। প্যারিসে প্রকাশ্যে মদ্যপান ও নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অ্যালকোহল বিক্রি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সামাজিক অনুষ্ঠান ইত্যাদি বন্ধ বা বাতিল করা হচ্ছে।

আমাদের দেশে অনেকে অবাক হবেন; কিন্তু সত্য এটা যে, প্রাচুর্যের মহাদেশ ইউরোপে গড়ে মাত্র ২০ শতাংশ বাড়িতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র বা এসি আছে। শীতের দেশের মানুষ এসি কেনে না। অনেকের কাছে এটি বিলাসিতা। কারণ ইউরোপে এসির দাম যেমন বেশি, তেমনই বিদ্যুতের ব্যয়ও বেশি।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, এ তাপপ্রবাহে জলবায়ুর পরিবর্তন, যা মূলত মানুষের নিজের হাতে সৃষ্ট। ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশন (ডব্লিউডব্লিউএ) বলেছে, ৫০ বছর আগেও জুন মাসে এমন ব্যতিক্রমী তাপমাত্রা সৃষ্টি হওয়া ‘প্রায় অসম্ভব’ ছিল।

জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারে শিল্পবিপ্লবের আগের সময়ের তুলনায় পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা প্রায় ১ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। এটিও সত্য যে, বৈশ্বিক উষ্ণায়নে ইউরোপের ভূমিকা অনেক বেশি।

অবশ্য ইউরোপ ২০৫০ সালের মধ্যে কার্বন নির্গমন শূন্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে; কিন্তু চলতি তাপপ্রবাহের অভিজ্ঞতা সে লক্ষ্যপূরণ অসম্ভব করতে পারে। সবাই এসির ব্যবহার শুরু করলে, ঘরে শান্তি পেলেও বাইরের উষ্ণতা আরো বাড়বে। প্যারিসে এক গবেষণায় দেখা গেছে, এসির ব্যাপক ব্যবহারে শহরের বাইরের তাপমাত্রা প্রায় ২ থেকে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়তে পারে।

এসি চালানোয় কার্বন দূষণ বাড়বে। দূষণের সাথে বাড়বে বৈশ্বিক তাপমাত্রাও। তখন এসির চাহিদা আরো বাড়বে। এভাবে বিষয়টি কার্যত একটি দুষ্টচক্রের অংশ। কিন্তু এটি কেবল ইউরোপের জন্য দুশ্চিন্তার বিষয় নয়। গোটা বিশ্বের জন্য জরুরি সতর্কবার্তা।

বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান শিকার। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায় উপকূলীয় অঞ্চলসহ বিরাট এলাকা পানিতে তলিয়ে যাওয়ার ঝুঁকির মুখে। উপকূলবাসী কোটি মানুষ সুপেয় পানির তীব্র সঙ্কটে ভুগছে। লবণাক্ততা বেড়ে সুন্দরবনের মতো ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল এবং জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির সম্মুখীন। ঝড়, বন্যা, খরা, অতিবৃষ্টির মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের পরিমাণ ও মাত্রা ক্রমে বাড়ছে। কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তা চরম হুমকিতে পড়ছে। জলবায়ু উদ্বাস্তু ও বাস্তুচ্যুতির পাশাপাশি মারাত্মক হয়ে উঠছে জনস্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব।

সমস্যার সমাধান যে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির হার শূন্যে নামানোর ওপর নির্ভরশীল সেটি সবাইকে বুঝতে হবে। সে জন্য কার্যকর ব্যবস্থাও নিতে হবে।